• বৃহস্পতিবার ১৩ জুন ২০২৪ ||

  • জ্যৈষ্ঠ ৩০ ১৪৩১

  • || ০৫ জ্বিলহজ্জ ১৪৪৫

মাদারীপুর দর্পন
ব্রেকিং:
শিশুর যথাযথ বিকাশ নিশ্চিতে সকল খাতকে শিশুশ্রমমুক্ত করতে হবে শিশুশ্রম নিরসনে প্রত্যেককে আরো সচেতন হতে হবে : প্রধানমন্ত্রী ব্যবসায়িদের প্রতি নিয়ম নীতি মেনে কার্যক্রম পরিচালনার আহ্বান বিনামূল্যে সরকারি বাড়ি গৃহহীনদের আত্মমর্যাদা এনে দিয়েছে প্রধানমন্ত্রীর জিসিএ লোকাল অ্যাডাপটেশন চ্যাম্পিয়নস অ্যাওয়ার্ড গ্রহণ প্রধানমন্ত্রীকে বদলে যাওয়া জীবনের গল্প শোনালেন সুবিধাভাগীরা আশ্রয়ণের ঘর মানুষের জীবন বদলে দিয়েছে: প্রধানমন্ত্রী ঘূর্ণিঝড়ে ক্ষতিগ্রস্ত ঘরবাড়ি তৈরি করে দেব : প্রধানমন্ত্রী নতুন সেনাপ্রধান ওয়াকার-উজ-জামান প্রধানমন্ত্রীর আশ্রয়ণ প্রকল্পের ঘর পাচ্ছে সাড়ে ১৮ হাজার পরিবার

‘দরবেশ বাবা’ পরিচয়ে ৭ কোটি টাকা আত্মসাৎ

মাদারীপুর দর্পন

প্রকাশিত: ১৮ সেপ্টেম্বর ২০২৩  

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ফেসবুকে বিজ্ঞাপন দেখে ব্যক্তিগত সমস্যা সমাধানের জন্য একজন ‘দরবেশের’ শরণাপন্ন হয়েছিলেন অবসরপ্রাপ্ত সরকারি কর্মকর্তা আনোয়ারা বেগম (৫৯)। কয়েক দফায় ওই দরবেশকে সাত কোটি টাকা দেন তিনি। একপর্যায়ে প্রতারিত হচ্ছেন বুঝতে পেরে রাজধানীর মোহাম্মদপুর থানায় একটি মামলা করেন। মামলার তদন্তভার পায় পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগ (সিআইডি)। সম্প্রতি কথিত ওই দরবেশকে গ্রেফতার করা হয়েছে।

গ্রেফতাররা হলেন- তানজিল আহমেদ ওরফে তানজিদ হাসান ও মো. হাসেম। রোববার (১৭ সেপ্টেম্বর) বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন সিআইডির অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (মিডিয়া) আজাদ রহমান।

তিনি বলেন, রাজধানীর মোহাম্মদপুরের বাসিন্দা আনোয়ারা বেগম সরকারি কর্মকর্তা ছিলেন। তার তিন ছেলে-মেয়ে দেশের বাইরে থাকেন। স্বামী দেশের একজন নামকরা চিকিৎসক। চাকরি থেকে অবসরের পর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ফেসবুকে সময় কাটাতেন তিনি। পারিবারিক একটি সমস্যা সমাধানের জন্য উপায় খুঁজতে থাকেন। হঠাৎ একদিন ফেসবুক স্ক্রল করার সময় তার সামনে একটি বিজ্ঞাপন আসে।

বিজ্ঞাপনে দেখা যায়, একজন সৌম্য চেহারার দরবেশ বেশধারী ব্যক্তি নিজেকে সৌদি আরবের মসজিদে নববীর ইমাম পরিচয় দিয়ে বলছেন, তিনি কোরআন হাদিসের আলোকে মানুষের সমস্যা সমাধানে কাজ করেন। স্বামী-স্ত্রীর অমিল, বিয়ে না হওয়া, বাচ্চা না হওয়া, লটারি জেতানোসহ বিভিন্ন সমস্যার সমাধান করেন। বিজ্ঞাপনে দুজন মেয়ের সাক্ষাৎকার দেখায় যেখানে মেয়ে দুটিকে বলতে শোনা যায়, তারা এ দরবেশ বাবার কাছ থেকে তাদের সমস্যার সমাধান পেয়েছেন।

এটা দেখে আনোয়ারা বেগম তার বাসার গৃহপরিচারির সঙ্গে আলোচনা করেন। সেই মেয়ে তখন তাকে জানায়, জ্বীন-পরীর মাধ্যমে দরবেশ বাবারা এসব সমস্যার সমাধান করে। তার গ্রামের কয়েকজনের এভাবে সমস্যার সমাধান হয়েছে। এটা শুনে আনোয়ারা উৎসাহিত হোন এবং বিজ্ঞাপনে দেওয়া মোবাইল নম্বরে ফোন করেন। ফোন দেওয়ার সঙ্গে সঙ্গে দরবেশ বাবা বেশধারী ব্যক্তি খুব সুন্দর করে কথা বলেন এবং তার পারিবারিক সমস্যা শুনতে চায়। তিনি তখন তার পারিবারিক কিছু সমস্যার কথা দরবেশ বাবার সঙ্গে আলোচনা করেন।

এরপর দরবেশ বাবা তার সমস্যার কথা শুনে তাকে বলেন, ‌‌মা তোমার সব সমস্যা সমাধান হয়ে যাবে। বাবার ওপর আস্থা রাখো। আমি তোমাকে মা বলে ডাকলাম। আজ থেকে তুমি আমার মেয়ে। তবে কিছু খরচ লাগবে মা। খরচের কথা কাউকে জানানো যাবে না। যদি জানাও তবে তোমার সমস্যা সমাধান হবে না। বিপরীতে তোমার সমস্যা আরও বাড়বে এবং তোমার ছেলে-মেয়ে ও স্বামীর ক্ষতি হবে।’’ এরূপ সুন্দর ব্যবহার ও কথা বলে দরবেশ বাবা তার বিকাশ নম্বরে একটা বড় অ্যামাউন্টের টাকা বিকাশ করতে বলেন। আনোয়ারা বেগম দরবেশ বাবার সুন্দর ব্যবহার ও কথায় ভক্ত হয়ে যায়। তখন ওই নম্বরে বিকাশে টাকা পাঠান। এভাবে বিভিন্ন তারিখ ও সময়ে দরবেশ বাবা আনোয়ারা বেগমকে ফোন করে বিভিন্ন অজুহাতে ও ব্যক্তিগত সমস্যা সমাধানের প্রলোভন দেখিয়ে প্রায় সাত কোটি টাকা হাতিয়ে নেন। একসময় আনোয়ারা বেগম বুঝতে পারেন তিনি প্রতারকের খপ্পরে পড়েছেন, তখন প্রতিকার পাওয়ার জন্য মোহাম্মদপুর থানায় মামলা করেন। সিআইডিতে আবেদন করেন

তিনি আরও বলেন, ভুক্তভোগীর অভিযোগ পেয়ে সিআইডির সাইবার পুলিশ সেন্টারের একটি টিম অভিযোগের সত্যতা যাচাই করে আসামিদের শনাক্ত করে। রাজধানীর উত্তরা এলাকায় অভিযান চালিয়ে প্রতারকদের গ্রেফতার করা হয়।

গ্রেফতার তানজিদ হাসানকে প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে প্রাপ্ত তথ্যের বরাত দিয়ে সিআইডিকে জানায়, এ চক্রের মূলহোতা হাসেম। হাসেম প্রথমে বিকাশ ও রকেটের মাধ্যমে ছোট ছোট অ্যামাউন্টের টাকা নিতো। এরপর বড় অ্যামাউন্টের টাকা নেওয়ার সময় তানজিদ আনোয়ারার কাছে পাঠাতো। তানজিদ ৩০ থেকে ৪০ লাখ টাকা নিয়ে যেত প্রতিবার। এভাবে ধাপে ধাপে তারা আনোয়ার কাছ থেকে প্রায় সাত কোটি টাকা নেয়।

প্রতারক হাসেম সিআইডিকে জানায়, ২০০৫ সাল থেকে এ কাজ করছে তিনি। প্রথম দিকে বিভিন্ন পত্রিকা ও টিভি চ্যানেলে বিজ্ঞাপন দিতেন। পরে ২০১৬ সাল থেকে পত্রিকা ও টিভি চ্যানেলের পাশাপাশি ইউটিউব ও ফেসবুকে বিজ্ঞাপন দেওয়া শুরু করেন। প্রতিমাসে ফেসবুকে চার লাখ টাকা খরচ করে বিজ্ঞাপন দিতেন এবং পোস্টবুস্ট করতেন, যাতে তার বিজ্ঞাপন সব মানুষের কাছে পৌঁছে যায়। তিনি মধ্যপ্রাচ্যে কর্মরত স্বল্প শিক্ষিত প্রবাসী বাঙালিদের টার্গেট করে সৌদি আরব, দুবাই, ওমানসহ সিঙ্গাপুর ও মালয়েশিয়াতে দেশ ভিত্তিক বিজ্ঞাপন প্রচার করতেন। এছাড়া ইউরোপের দেশগুলোর মধ্যে ইতালি ও ফ্রান্সে বিজ্ঞাপন প্রচার করতেন। এভাবে তিনি পত্রিকা, টিভি চ্যানেল, ইউটিউব ও ফেসবুকে বিজ্ঞাপন দেওয়ার মাধ্যমে অসংখ্য মানুষের সঙ্গে দরবেশ বাবা পরিচয় দিয়ে কথা বলতেন ও তাদের থেকে বিভিন্ন ভয়-ভীতি ও প্রলোভন দেখিয়ে কৌশলে টাকা হাতিয়ে নিতেন। প্রতারক হাসেম হিন্দি ও আরবি ভাষায় কথা বলাসহ বিভিন্ন কণ্ঠে কথা বলতে পারেন। যেমন জীনপরীর কণ্ঠ, ২০০ বছরের হুজুরের কণ্ঠ, ১০০ বছরের বাবার কণ্ঠ।

এ প্রতারক ফ্রান্স প্রবাসী ইমাম হোসেন (৪০) দরবেশ বাবা পরিচয় দিয়ে তাকে ১২ কোটি টাকার লটারি জিতিয়ে দেওয়ার প্রলোভন দেখিয়ে দেড় কোটি টাকা হাতিয়ে নেন। আরেক ইতালী প্রবাসীর থেকে একইভাবে লটারি ও জুয়ায় টাকা জিতিয়ে দেওয়ার কথা বলে ৪০ লাখ টাকা হাতিয়ে নেন।

সিআইডি টিম খোঁজ নিয়ে জানতে পারে, ফ্রান্স প্রবাসী ইমাম হোসেনের পরিবার দেশের একটি প্রত্যন্ত গ্রামে বাস করেন। প্রবাসীর বউ বাচ্চা খেয়ে না খেয়ে অত্যন্ত কষ্টে দিনযাপন করছেন। অথচ প্রবাসে তার কষ্টে উপার্জন করা টাকায় ভন্ড দরবেশ বাবা বাড়ি-গাড়ি করে বিলাসবহুল জীবনযাপন করছেন। প্রবাসী ইমাম হোসেন একপর্যায়ে তার বড় বোনকেও দরবেশ বাবার ভক্ত বানিয়ে ফেলেন। বড় বোন তার ছেলের ইউনির্ভাসিটিতে ভর্তি হওয়ার জন্য জমানো টাকা পর্যন্ত ভাইয়ের কথায় দরবেশ বাবাকে দিয়ে দিয়েছেন।

সিআইডির অনুসন্ধানে জানা যায়, মধ্যপ্রাচ্যে এ প্রতারক চক্রের এরকম ২০/২৫ জন ক্লায়েন্ট আছে, মালয়েশিয়াতে আছে ১০/১২ জন। এর মধ্যে ৫/৬ জন ফিক্সড ক্লায়েন্ট আছে যারা গত ৪/৫ বছর ধরে নিয়মিত এ দরবেশ বাবাকে টাকা দিয়ে আসছে।