• শুক্রবার ১৪ জুন ২০২৪ ||

  • জ্যৈষ্ঠ ৩১ ১৪৩১

  • || ০৬ জ্বিলহজ্জ ১৪৪৫

মাদারীপুর দর্পন
ব্রেকিং:
তারেকসহ পলাতক আসামিদের গ্রেফতারের চেষ্টা চলছে কোরবানির পশু বেচাকেনা এবং ঘরমুখো মানুষের নিরাপত্তার নির্দেশ তিস্তা মহাপরিকল্পনা বাস্তবায়নে চীনের কাছে ঋণ চেয়েছি গ্লোবাল ফান্ড, স্টপ টিবি পার্টনারশিপ শেখ হাসিনাকে বিশ্বনেতৃবৃন্দের জোটে চায় শিশুর যথাযথ বিকাশ নিশ্চিতে সকল খাতকে শিশুশ্রমমুক্ত করতে হবে শিশুশ্রম নিরসনে প্রত্যেককে আরো সচেতন হতে হবে : প্রধানমন্ত্রী ব্যবসায়িদের প্রতি নিয়ম নীতি মেনে কার্যক্রম পরিচালনার আহ্বান বিনামূল্যে সরকারি বাড়ি গৃহহীনদের আত্মমর্যাদা এনে দিয়েছে প্রধানমন্ত্রীর জিসিএ লোকাল অ্যাডাপটেশন চ্যাম্পিয়নস অ্যাওয়ার্ড গ্রহণ প্রধানমন্ত্রীকে বদলে যাওয়া জীবনের গল্প শোনালেন সুবিধাভাগীরা

কাঁটাতারের বেড়া কেটে ক্যাম্পের বাইরে যাচ্ছেন রোহিঙ্গারা

মাদারীপুর দর্পন

প্রকাশিত: ৫ সেপ্টেম্বর ২০২৩  

কাঁটাতারের বেড়া কেটে নিজেদের মতো দুই শতাধিক গেট তৈরি করার অভিযোগ উঠেছে ক্যাম্পে থাকা রোহিঙ্গাদের বিরুদ্ধে। নিয়ন্ত্রণহীন এসব গেট দিয়ে ক্যাম্প ছেড়ে দেশের বিভিন্ন স্থানে চলে যাওয়ার চেষ্টার পাশাপাশি লোকালয়ে গিয়ে অপরাধে জড়াচ্ছেন রোহিঙ্গারা। ক্যাম্পের বাইরে যাওয়া এসব রোহিঙ্গাকে দেশের নিরাপত্তার জন্য হুমকি হিসেবে দেখছেন স্থানীয় জনপ্রতিনিধিরা।

সরেজমিনে দেখা যায়, কক্সবাজার-টেকনাফ সড়কের পাশেই উখিয়ার কুতুপালং ক্যাম্প। এ ক্যাম্পের চারপাশে রয়েছে কাঁটাতারের নিরাপত্তা বেষ্টনি। কিন্তু এ ক্যাম্পের এক কিলোমিটার এলাকায় ১০টি অংশে কাঁটাতারের বেড়া কেটে তৈরি করা হয়েছে গেট। আর এসব গেট দিয়ে নিজেদের মতো করে অবাধে যাতায়াত করছেন রোহিঙ্গারা।

কুতুপালংয়ের আমগাছতলা এলাকায় দেখা যায়, কাঁটাতারের বেড়ার সঙ্গে রয়েছে একটি গ্রিলের গেট। এ গেট পার হয়ে সহজে ক্যাম্প ছেড়ে বের হয়ে যাচ্ছেন রোহিঙ্গা নারী, পুরুষ ও শিশুরা। একই গেটের পাশে রয়েছে একটি ছোট ফাঁক। ওই ফাঁক দিয়েও ক্যাম্প ছেড়ে বের হয়ে যাচ্ছেন শত শত রোহিঙ্গা।

সড়কে দেখা ক্যাম্প-২ ইস্টের ব্লক এ/৭-এর বাসিন্দা ওমর ফয়সাল (৩১) বলেন, ‘ক্যাম্প থেকে বের হয়েছি কাজে যাওয়ার জন্য। রাস্তায় দাঁড়িয়ে ্ছআ গাড়িতে উঠার জন্য।’

ক্যাম্প-২ ব্লক-বি-এর বাসিন্দা মোহাম্মদ রফিক বলেন, ‘ক্যাম্পের ভেতরে থাকি। কিন্তু কাঁটাতারের বেড়ার কারণে ক্যাম্প থেকে বের হতে পারি না। তাই কাঁটাতারের বেড়া কেটে যেসব স্থানে ফাঁক করা হয়েছে, সেদিক দিয়ে বের হয়ে বাজারে যাতায়াত করি।’

কুতুপালং রেজিস্ট্রার ক্যাম্পের বাসিন্দা মোহাম্মদ ইছহাক বলেন, ‘কাঁটাতারের বেড়ার কারণে ক্যাম্প থেকে সহজে যাতায়াত করা যায় না। এ জন্য অনেকেই কাঁটাতার কেটে বেড়ার ফাঁক করেছে ক্যাম্প থেকে বের হওয়ার জন্য। এখন ওই ফাঁক দিয়ে ক্যাম্প থেকে বের হয়েছি। অটোরিকশা চালাব আর কাজকর্ম করব।’

কুতুপালং রেজিস্ট্রার ক্যাম্পের আরেক বাসিন্দা ছলমা খাতুন বলেন, কুতুপালং ক্যাম্প থেকে বের হয়েছি বালুখালী যাওয়ার জন্য। সেখানে আত্মীয়ের বাড়িতে যাব।

শুধু এখানে নয়, কক্সবাজারের উখিয়া ও টেকনাফের ৩৩টি ক্যাম্পেও একই অবস্থা। কাঁটাতারের বেষ্টনির ২০০ অংশে কেটে রোহিঙ্গারা নিজেদের ইচ্ছেমতো গেট তৈরি করে ক্যাম্প ছেড়ে যাতায়াত করছে লোকালয়ে। তারপর কক্সবাজারসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে ছড়িয়ে পড়ছেন রোহিঙ্গারা।

বালুখালী ক্যাম্প-৮-এর বাসিন্দা ইউসুফ বলেন, ‘এপিবিএনের চেকপোস্ট আছে। তাই কাঁটাতারের বেড়া যেদিকে কাটা ছিল, ওইখান দিয়ে বের হয়েছি। সারা দিন উখিয়ার একটি গ্রামে কৃষিকাজ করেছি। এখন কাজ শেষে ক্যাম্পে ফিরে যাচ্ছি।’

টিভি টাওয়ার ক্যাম্প-২-এর বাসিন্দা খায়রুল আমিন বলেন, ‘কে বা কারা কাঁটাতারের বেড়া কেটেছে জানি না। শুধু এখানে নয়, কিছুদূর পরপর কাঁটাতারের বেড়া কেটে তৈরি করা যাতায়াতের অনেক পথ রয়েছে। এসব পথ দিয়ে প্রতিদিন হাজার হাজার রোহিঙ্গা ক্যাম্প থেকে বের হচ্ছে। শুধু রোহিঙ্গা নয়, ক্যাম্পে যারা এনজিও সংস্থায় চাকরি করেন তারাও এসব পথ ব্যবহার করেন।’

ক্যাম্পের প্রবেশদ্বারে রোহিঙ্গাদের ছড়িয়ে পড়া বন্ধে বসানো হয়েছে এপিবিএন পুলিশের চেকপোস্ট। কিন্তু অনেক সময় চেকপোস্টগুলোর শিথিলতার সুযোগে ফাঁকফোকর দিয়েও বের হচ্ছে রোহিঙ্গারা। একই সঙ্গে মেরিন ড্রাইভ কিংবা কক্সবাজার-টেকনাফ সড়কে তুলে নেয়া হয়েছে অনেক চেকপোস্ট। স্থানীয়দের দাবি, ক্যাম্প ছেড়ে বেরিয়ে যাওয়া রোহিঙ্গারা দেশের নিরাপত্তার জন্য হুমকি।

উখিয়ার রাজাপালং ইউনিয়ন পরিষদের ইউপি সদস্য হেলাল উদ্দিন বলেন, গেল ৬ বছরে একজন রোহিঙ্গাকেও প্রত্যাবাসন করা হয়নি। আর রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসনের কোনো আশাও দেখছি না। এর কারণে রোহিঙ্গারা ক্যাম্প ছেড়ে লোকালয়ে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে পড়ার প্রবণতা লক্ষ করা যাচ্ছে। রোহিঙ্গারা ক্যাম্প ছেড়ে যেভাবে বের হচ্ছে এটা খুবই আতঙ্ক ও উদ্বেগের বিষয়। এটা দেশের নিরাপত্তার জন্য হুমকির বলে মনে করছি।

রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসন সংগ্রাম পরিষদের প্রতিষ্ঠাতা মাহমুদুল হক চৌধুরী বলেন, রোহিঙ্গারা ছড়িয়ে-ছিটিয়ে পড়ার কারণে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি দিন দিন অবনতি হচ্ছে। এভাবে রোহিঙ্গা ক্যাম্প ছেড়ে সারা দেশে ছড়িয়ে পড়লে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির আরও অবনতি হবে। তাই সরকার, প্রশাসন, সকল আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সমন্বয়ে রোহিঙ্গাদের ক্যাম্প ছেড়ে বের হয়ে যাওয়া বন্ধের উদ্যোগ নিতে হবে। পাশাপাশি কক্সবাজার-টেকনাফ সড়ক ও মেরিন ড্রাইভে চেকপোস্টগুলো সচল করে নজরদারি বাড়ানোর উদ্যোগ নিতে হবে। তা নাহলে রোহিঙ্গারা দেশের নিরাপত্তার জন্য হুমকি হয়ে দাঁড়াবে।

তবে ক্যাম্পের নিরাপত্তার দায়িত্বে থাকা এপিবিএন বলছে, রোহিঙ্গাদের ক্যাম্প ছেড়ে ছড়িয়ে পড়া ঠেকাতে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেয়া হচ্ছে।

উখিয়া ৮ এপিবিএনের অধিনায়ক মো. আমির জাফর বলেন, প্রত্যাবাসন নিয়ে রোহিঙ্গারা যেহেতু আশার আলো দেখছে না আর দীর্ঘায়িত হচ্ছে; এর জন্য রোহিঙ্গারা ক্যাম্পের গণ্ডি থেকে বেরিয়ে পড়ার চেষ্টা করছে। বিশেষ করে কাঁটাতারের বেড়া কেটে তারা অসংখ্য পথ তৈরি করেছে। এসব পথ দিয়ে রোহিঙ্গারা বেরিয়ে পড়ার চেষ্টা করছে এবং অবাধে বেরও হয়ে যাচ্ছে।

তিনি বলেন, ক্যাম্প ছেড়ে রোহিঙ্গাদের বেরিয়ে পড়া বন্ধে চেকপোস্টগুলোতে কড়াকড়ি করা হয়েছে। অনুমতিপত্র দেখানো ছাড়া কাউকে ক্যাম্প থেকে বের হতে দেয়া হচ্ছে না। এ ছাড়াও উখিয়া ডিগ্রি কলেজের সামনে নতুন করে চেকপোস্ট স্থাপন করা হয়েছে। চেকপোস্ট থেকে রোহিঙ্গাদের ধরে ক্যাম্পে ফেরত পাঠানো হচ্ছে। একই সঙ্গে উপজেলা প্রশাসন ও পুলিশ উদ্যোগ গ্রহণ করেছে। রোহিঙ্গাদের ক্যাম্প ছেড়ে বাইরে যাওয়া রোধ করতে নিয়মিত টহল ও অভিযান পরিচালনা করা হচ্ছে।

অধিনায়ক আরও বলেন, কাঁটাতারের বেড়া কেটে ২০০ স্থান দিয়ে রোহিঙ্গারা বেরিয়ে ক্যাম্প ছেড়ে অবাধে ছড়িয়ে পড়ছে। এই ২০০ স্থানও চিহ্নিত করা হয়েছে। এখন এই স্থানগুলো দ্রুত মেরামত করা প্রয়োজন। এ বিষয়ে সংশ্লিষ্ট দফতরকে জানানো হয়েছে।

রোহিঙ্গাদের ক্যাম্প থেকে পালিয়ে অন্যত্র চলে যাওয়া, অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডে জড়িয়ে পড়া এবং বিদেশ পাচার রোধকল্পে ২০২০ সালে ক্যাম্পের চারপাশে দেয়া হয় কাঁটাতারের বেষ্টনী।
 
২০১৭ সালের ২৫ আগস্ট মিয়ানমার সেনাবাহিনী উত্তর রাখাইন রাজ্যে রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীকে তাদের মাতৃভূমি থেকে বিতাড়িত করতে ব্যাপক আক্রমণ শুরু করে। পরবর্তী সপ্তাহগুলোতে সেনারা বেসামরিক রোহিঙ্গা নাগরিকদের হত্যা, ধর্ষণ ও নির্যাতন করে এবং ওই অঞ্চলে রোহিঙ্গা গ্রামগুলো পুড়িয়ে দেয়।
 
তথ্য-উপাত্ত বলছে, মিয়ানমার সেনাবাহিনীর অভিযানে ও স্থানীয় অধিবাসীদের হামলায় কয়েকদিনে অন্তত ১০ হাজার রোহিঙ্গা নারী, পুরুষ ও শিশু নিহত হয়। ৩ শতাধিক গ্রাম পুড়িয়ে তামা করে দেয়া হয়। নির্যাতন ও নিপীড়নের মুখে ৭ লাখের বেশি রোহিঙ্গা সীমানা পেরিয়ে বাংলাদেশে পালিয়ে আসতে বাধ্য হয়। যারা আগে থেকে আশ্রয় নেয়া আরও কয়েক লাখ রোহিঙ্গার সঙ্গে যোগ দেয়।