• বৃহস্পতিবার   ০৭ জুলাই ২০২২ ||

  • আষাঢ় ২৩ ১৪২৯

  • || ০৭ জ্বিলহজ্জ ১৪৪৩

মাদারীপুর দর্পন

নিয়োগ পরীক্ষায় উত্তীর্ণের চুক্তি ১৫ লাখে!

মাদারীপুর দর্পন

প্রকাশিত: ১৯ মে ২০২২  

নিয়োগ পরীক্ষায় পাশ করিয়ে দেওয়ার নামে পরীক্ষার্থীর সঙ্গে চুক্তি হতো ১০-১৫ লাখ টাকার। এজন্য পরীক্ষার আগেই অগ্রীম দিতে হতো অন্তত ২ লাখ টাকা।

এরপর পরীক্ষার্থীকে সরবরাহ করা হতো হিডেন স্পাই ওয়্যারলেস কিট। যার মাধ্যমে বাইরে থেকে সরবরাহ করা হতো প্রশ্নপত্রের সমাধান।

সম্প্রতি চলমান প্রাথমিক বিদ্যালয়ে সহকারী শিক্ষক নিয়োগ পরীক্ষা ঘিরে তৎপর হয়ে ওঠা এই চক্রের মূলহোতা ইকবাল হোসেনসহ (৪২) চারজনকে আটক করেছে র‌্যাপিড অ্যাকশন ব্যাটালিয়ন (র‌্যাব-২)।

আটক বাকি তিনজন হলেন- রমিজ মৃধা (৩০), নজরুল ইসলাম (৫০) ও মোদাচ্ছের হোসেন (৬২)।

এদের মধ্যে ইকবাল একটি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষক হিসেবে কর্মরত রয়েছেন। নজরুল আগারগাঁও সমাজসেবা অধিদপ্তরের কম্পিউটার অপারেটর ও মোদাচ্ছের মুজিবনগর সমাজসেবা কার্যালয়ের সাবেক সমাজকর্মী। এছাড়া, রমিজ একটি বিশ্ববিদ্যালয় থেকে মাস্টার্স পাস করার পর এই চক্রের সঙ্গে জড়িত হয়ে ডিভাইসগুলো পরিচালনার দায়িত্ব পালন করে আসছিলেন।

বুধবার (১৮ মে) রাতে রাজধানীসহ আশে-পাশের এলাকায় অভিযান চালিয়ে তাদেরকে আটক করা হয়। এ সময় তাদের কাছ থেকে বেশকিছু ডিভাইস ও বিভিন্ন আলামত জব্দ করা হয়।

র‌্যাব জানায়, চক্রটি গত ২২ এপ্রিল প্রাথমিকের নিয়োগ পরীক্ষায় ১৬ জনকে এ ডিভাইস সরবরাহের মাধ্যমে উত্তর সরবাহ করেছে বলে প্রাথমিকভাবে জানা গেছে। আগামী ২০ এপ্রিল অনুষ্ঠিতব্য প্রাথমিকের নিয়োগ পররীক্ষায় আরো ১২-১৪ জনকে ডিভাইসের মাধ্যমে উত্তর সরবরাহের চুক্তি হয়েছিল। এর আগেই চক্রের মূলহোতাসহ চারজনকে আটক করে র‌্যাব।

বৃহস্পতিবার (১৯ মে) দুপুরে রাজধানীর কারওয়ানবাজার র‌্যাব মিডিয়া সেন্টারে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে এসব কথা জানান র‌্যাবের লিগ্যাল অ্যান্ড মিডিয়া উইংয়ের পরিচালক কমান্ডার খন্দকার আল মঈন।

তিনি বলেন, এই চক্রের সদস্যরা প্রথমে বিভিন্ন সরকারি ও বেসরকারি নিয়োগ পরীক্ষা সম্পর্কে তথ্য সংগ্রহ করে। পরবর্তীতে ওই নিয়োগ পরীক্ষার হল ও পরীক্ষার গার্ড সম্পর্কে তথ্য উপাত্ত সংগ্রহ করে।

এরপর তারা দেশের বিভিন্ন অঞ্চলের চাকরি প্রত্যাশিদের খুঁজে বের করে চাকরি পাইয়ে দেওয়ার নামে ১০-১৫ লাখ টাকার চুক্তি করে। যারা রাজি হতেন অগ্রীম ২ লাখ টাকা দেওয়ার পর পরীক্ষার্থীদের ডিজিটাল ডিভাইসগুলো সরবরাহ করা হতো।

যেগুলোর একটি অংশ পরীক্ষার্থীদের কানের ভেতর এবং অটোমেটিক কল রিসিভ হওয়া সিম লাগানো অপর অংশটি শরীরের বিভিন্ন স্থানে লুকিয়ে রেখে হলে প্রবেশ করানো হয়।

পরীক্ষা শুরু হওয়ার পর কোনোভাবে প্রশ্নের ছবি চলে আসতো চক্রের হাতে। তাৎক্ষণিকভাবে বাইরে মেধাবীদের একটি টিমের মাধ্যমে প্রশ্নপত্র সমাধান করে ওই ডিভাইসের মাধ্যমে উত্তর বলে দেওয়া হতো।

র‌্যাবের এই কর্মকর্তা বলেন, চক্রের মূলহোতা ইকবাল হোসেন ২০০৮ সালে সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষক হিসেবে নিয়োগপ্রাপ্ত হন। ২০১৫ সালে একই এলাকার অবসরপ্রাপ্ত সরকারি কর্মচারী আলতাফ হোসেন নামে একজনের সঙ্গে পরিচয়ের সূত্রে এই চক্রে জড়িয়ে যান ইকবাল। ২০২০ সালে করোনায় আলতাফ মারা যাওয়ার পর চক্রটি নিজেই পরিচালনা শুরু করেন ইকবাল।

আটক রমিজ এই চক্রের অন্যতম সহযোগী। ২০২০ সালে ইকবালের সঙ্গে পরিচয় সূত্রে এই চক্রে জড়ান। ইলেক্ট্রনিক্স ডিভাইস সম্পর্কে তার ভালো অভিজ্ঞতা থাকায় গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পালন করে। পরীক্ষার সময় পরিক্ষার্থীদেরকে ডিজিটাল ডিভাইসগুলোর মাধ্যমে সংযুক্ত করে বাইরে থেকে উত্তর সরবরাহ করতো রমিজ।

এক প্রশ্নের জবাবে র‌্যাবের এই কর্মকর্তা বলেন, মোদাচ্ছের আর নজরুল মূলত পরীক্ষা কোনো হলে অনুষ্ঠিত হবে, গার্ড কে থাকবে খোঁজখবর নিতেন। এরপর পরীক্ষা শুরুর পর পর কারো মাধ্যমে প্রশ্নের ছবি হোয়াটসঅ্যাপে তাদের কাছে চলে আসতো। আমরা সেসব লোকজনদের বিষষয়ে খোঁজ নিচ্ছি।

অপর এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, চক্রটি ২০১৫ সাল থেকে চাকরি প্রার্থীদের সঙ্গে চাকরি পাইয়ে দেওয়ার বিষয়ে ১০-১৫ লাখ টাকায় চুক্তি করতেন। আনুমানিক ৩০ জনের সঙ্গে চুক্তি করলে ২-৩ জনকে কোনোভাবে চাকরি পাইয়ে দেওয়ার চেষ্টা করতেন এরা। অনেক সময় স্বাভাবিকভাবেই ৩-৪ জন চাকরি পেয়ে যেতেন। এভাবে কোটি কোটি টাকা হাতিয়ে নিয়েছে চক্রটি।

২০২০ সাল থেকে ডিভাইসের মাধ্যমে নতুন পন্থায় চাকরি নিয়োগ পরীক্ষার এই প্রতারণা শুরু করে চক্রটি। তারা অনেক পরীক্ষার্থীদের খোঁজে নেয় আবার অনেক সময় যারা পরীক্ষায় অংশ নেন তারাই তাদের কাছে যান। গত ২২ এপ্রিল ১৬ জনকে এ প্রক্রিয়ায় উত্তর সরবরাহ করেছেন বলে জানতে পেরেছি, আমরা তাদের বিষয়েও খোঁজ নিচ্ছি।

এই ডিভাইসগুলো পার্শ্ববর্তী দেশ থেকে তারা এই অসৎ উদ্দেশ্যে এনেছে বলে জানিয়েছে। সাধারণত এধরনের ডিভাইসগুলো আইন-শৃঙ্খল বাহিনীর সদস্যরা ব্যবহার করে। আমরাও এগুলো কিনতে চাইলে যথাযথ নিয়ম মেনে কিনে থাকি। এর বাইরে কেউ এসব ডিভাইস বিক্রয় করছে কি-না আমাদের নজরদারী অব্যাহত থাকবে।