• মঙ্গলবার   ১৬ আগস্ট ২০২২ ||

  • শ্রাবণ ৩১ ১৪২৯

  • || ১৮ মুহররম ১৪৪৪

মাদারীপুর দর্পন

‘পদ্মা সেতু ও রপ্তানি আয় জাতির সক্ষমতা প্রমাণ করছে’

মাদারীপুর দর্পন

প্রকাশিত: ৪ জুলাই ২০২২  

রপ্তানি আয়ে বাংলাদেশ এখন ৫০ বিলিয়ন ডলারের ঘরে। এই সূচক বাংলাদেশের সক্ষমতার জানান দিচ্ছে, যেমন সক্ষমতা জানান দিচ্ছে নিজস্ব অর্থায়নে পদ্মা সেতু নির্মাণ। রপ্তানি আয়ের এমন অর্জন নিয়ে প্রতিক্রিয়া জানান বিশিষ্ট অর্থনীতিবিদ তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সাবেক উপদেষ্টা এবি মির্জা আজিজুল ইসলাম, বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক গভর্নর ড. ফরাসউদ্দিন ও ড. সালেহউদ্দিন আহমেদের।

মির্জা আজিজুল ইসলাম রপ্তানি আয়ের এমন সূচকে সন্তোষ প্রকাশ করে বলেন, ‘রপ্তানি আয়ের যে হিসাব, তা নিঃসন্দেহে ইতিবাচক বার্তা দিচ্ছে। কিন্তু মাথায় রাখতে হবে আমদানি প্রবৃদ্ধি রপ্তানির চেয়ে বেশি। এখানে ভারসাম্য রক্ষা না হলে সুফল আসবে না। আমদানি বেশি হওয়ায় রিজার্ভ ঘাটতি পড়ে যাচ্ছে।’

রপ্তানি আয়ের ৮০ শতাংশের বেশি আসছে পোশাকখাত থেকে। একটি খাতের ওপর বছরের পর বছর ধরে নির্ভর থাকলে ঝুঁকি থাকেই। কোনো কারণে এই খাতে ধস নামলে বিপদে পড়তে হবে। রপ্তানি বৈচিত্র্য খুব জরুরি এখন। ইলেকট্রনিক্স, খাদ্যদ্রব্য, চামড়া শিল্প, চা, চামড়ার গুরুত্ব আরও বাড়িয়ে রপ্তানি আয় বাড়ানো দরকার।’

‘দ্বিতীয়ত, রপ্তানি আয়ের ৮০ শতাংশের বেশি আসছে পোশাকখাত থেকে। একটি খাতের ওপর বছরের পর বছর ধরে নির্ভর থাকলে ঝুঁকি থাকেই। কোনো কারণে এই খাতে ধস নামলে বিপদে পড়তে হবে। রপ্তানি বৈচিত্র্য খুব জরুরি এখন। ইলেকট্রনিক্স, খাদ্যদ্রব্য, চামড়া শিল্প, চা, চামড়ার গুরুত্ব আরও বাড়িয়ে রপ্তানি আয় বাড়ানো দরকার।’

‘বাজারের পরিধি বাড়াতে হবে। ইউরোপিয়ান ইউনিয়ন বা যুক্তরাষ্ট্র আমাদের প্রধান বাজার। জাপান, কোরিয়া, চীনের বাজারও ধরতে হবে। চেষ্টা করা হয়েছিল। সফল হয়নি। কিন্তু হাল ছাড়া যাবে না। বাজারের পরিধি বাড়াতেই হবে’ যোগ করেন আজিজুল ইসলাম।

উচ্ছ্বাস প্রকাশ করে মন্তব্য জানান ড. ফরাসউদ্দিন আহমেদও। তিনি বলেন, ‘সাত বছর আগে যখন বলা হয়েছিল যে, ৫০ বিলিয়ন ডলার রপ্তানি হবে, তখন অনেকেই বিশ্বাস করতে পারেনি। কিন্তু লক্ষ্যমাত্রার দশ বছর আগেই হয়ে গেলো। পদ্মা সেতু ও রপ্তানি আয় জাতির সক্ষমতা প্রমাণ করছে। রপ্তানি আয় আমাদের এখানে খুব টালমাটাল হয়নি। একটি গতি ধারণ করে এগিয়ে যাচ্ছি আমরা।’

‘তবে সমস্যাও আছে। আমরা রপ্তানি বহুমুখীকরণে জোর দেইনি এখনো। ৮০ শতাংশ পোশাকখাতে। এবার চামড়ায়ও খানিক বেড়েছে। পোশাকখাতের বাইরে গুরুত্ব দেওয়ার সময় এসেছে। যেমন- ওষুধ শিল্প বিশ্ববাজারে বিশেষ অবস্থান তৈরি করার ক্ষমতা রাখে। সরকারি সহায়তা এখানে জরুরি। মোটরসাইকেল, লাইট ইঞ্জিনিয়ারিং, কৃষিপণ্যের বিস্তার ঘটাতে হবে বিশ্ববাজারে। আমাদের আরও গবেষণা করা দরকার। সহায়তা বাড়ানো দরকার।’

‘পদ্মা সেতু ও রপ্তানি আয় জাতির সক্ষমতা প্রমাণ করছে। রপ্তানি আয় আমাদের এখানে খুব টালমাটাল হয়নি। একটি গতি ধারণ করে এগিয়ে যাচ্ছি আমরা।’

এই বিশ্লেষক বলেন, ‘ডলার প্রাইসটায় নজর দিতে হবে। অপ্রয়োজনীয় ও বিলাসবহুল আমদানি কমাতে হবে। এসব পণ্য দেশেই উৎপাদন করা যেতে পারে। যেমন- মিল্ক পাউডার, ফার্চার, নির্মাণসামগ্রী আমদানি কমিয়ে দেশেই তৈরি করার ব্যবস্থা করতে হবে। এখানে প্রণোদনা দিলে রপ্তানিও হবে।’

তিনি বলেন, ‘বাজেটে সরকার মূল্যস্ফীতি কমানোর কথা বলেছে। কিন্তু কোনো সুনির্দিষ্ট পলিসি নির্ধারণ করা হয়নি। গত বছর মূল্যস্ফীতি ছিল ৭ দশমিক ৫। বিশ্বেও তাই ছিল। এবার নির্ধারণ করা হয়েছে ৫ দশমিক ৬। এটি সম্ভব হবে বলে মনি করি না। আমদানি কমিয়ে এনে নিজেদের উৎপাদন বাড়াতে হবে। রপ্তানি আয় বাড়ানোর ক্ষেত্রে অনুসন্ধান করতে হবে আরও। চিন্তা-ভাবনা করে এগোতে হবে। মনে রাখতে হবে এখন আমাদের সুসময়।’

‘ভাবনার সময়ও আছে। পদ্মা সেতু নিজের টাকায় বানিয়ে বিশ্বকে তাক লাগিয়েছি। মুক্তিযুদ্ধের সুফল ভোগ করছি। চেতনা জাগ্রত করতে হবে। দুর্নীতি রোধ করার সময় এখন। দুর্নীতি একেবারে শেষ হবে না। কিন্তু কমিয়ে আনা সম্ভব হবে। পলিসি নির্ধারণ করতে পারলে আগামী দশ বছরে একশ বিলিয়নের ক্লাবে জায়গা পাবে বাংলাদেশ।’

ড. সালেহউদ্দিন আহমেদ বলেন, ‘রপ্তানিকারকদের বহুদিনের লক্ষ্য ছিল রপ্তানি আয় ৫০ বিলিয়ন ডলার অর্জন করা। এই লক্ষ্য সরকারেরও থাকে। তিন বছর আগে চট্টগ্রাম ক্লাবে গিয়ে এক সেমিনারে রপ্তানি আয়ের এই লক্ষ্যমাত্রা নিয়ে আলোচনায় অংশ নেই। অনেকেই ছিল সেখানে।

দুর্নীতি একেবারে শেষ হবে না। কিন্তু কমিয়ে আনা সম্ভব হবে। পলিসি নির্ধারণ করতে পারলে আগামী দশ বছরে একশ বিলিয়নের ক্লাবে জায়গা পাবে বাংলাদেশ।’

‘আমি মনে করি আজকের এই অর্জন রপ্তানিকারকদেরই বড় সফলতা। তবে সরকারের যথেষ্ট সহায়তা আছে বলে মনে করি। করোনার এই সময়ে সরকার যথেষ্ট প্রণোদনা দিয়েছে। বিশেষ করে পোশাকখাতের প্রণোদনা রপ্তানি আয় বাড়াতে সরাসরি ভূমিকা রেখেছে।’

তিনি বলেন, ‘তবে একটি বিষয় মাথায় রাখা দরকার। রপ্তানিটা প্রায় এককেন্দ্রিক হয়ে গেছে। এক খাতে নির্ভরতা থাকলে ঝুঁকি বেড়ে যায়। যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে জিএসপি নিয়ে এরই মধ্যে টানাপোড়েন শুরু হয়েছে। ইউরোপে যুদ্ধ চলছে। অনেক দেশ পোশাকখাতে এগিয়ে আসছে। রপ্তানি আয় ৫০ বিলিয়ন, চ্যালেঞ্জ আরও বাড়িয়েছে। বহুমাত্রিক রপ্তানিতে আমাদের মনোযোগ দিতে হবে।’

পোশাকখাতের অভিজ্ঞতা দিয়ে অন্যান্য খাতের রপ্তানি আরও বাড়ানো সম্ভব উল্লেখ করে তিনি বলেন, ‘খাদ্যপণ্য আমাদের রপ্তানি আয়ে বিশেষ সহযোগী হতে পারে। রপ্তানি হচ্ছে বটে। তবে আরও বাড়ানো যায়। ইলেক্ট্রনিক্স পণ্য রপ্তানি করতে পারি। চামড়া শিল্পের পরিধি বাড়াতে হবে। পাটজাত পণ্যের কদর বাড়ছে। হস্তজাত পণ্যের রপ্তানি বাড়ানো যায়। প্রচুর ফল বাইরে থেকে আমদানি করি আমরা। দামি এসব ফলের আমদানি কমিয়ে আমাদের দেশি ফল বাইরে রপ্তানি করার সময় এসেছে। আম যাচ্ছে বাইরে। কিন্তু প্রক্রিয়াজাতকরণ হয় না বলে সীমিত আকারে রপ্তানি হচ্ছে।’

চ্যালেঞ্জ প্রসঙ্গে এই অর্থনীতিবিদ বলেন, নতুন বাজার তৈরি করাই প্রধান চ্যালেঞ্জ। এটি রপ্তানিকারক ও সরকার মিলে মোকাবিলা করবে। কোন দেশে কোন পণ্যের চাহিদা রয়েছে, এটি যাচাই করা জরুরি। নতুন পণ্য রপ্তানি করা যে কোনো দেশের জন্যই চ্যালেঞ্জ। এক্ষেত্রে সরকার, ব্যাংকের সাপোর্ট লাগবে। সরকার পোশাকখাতে প্রণোদনা দিচ্ছে। এভাবে কৃষি বা অন্যান্য সেক্টরেও প্রণোদনা দিয়ে রপ্তানি আয় বাড়ানো সম্ভব। সরকার আসলে কী পলিসি নেয় সেটার ওপরই অনেক কিছু নির্ভর করে।’