• বুধবার   ০৬ জুলাই ২০২২ ||

  • আষাঢ় ২১ ১৪২৯

  • || ০৬ জ্বিলহজ্জ ১৪৪৩

মাদারীপুর দর্পন

পদ্মা সেতু পুনর্বাসন কেন্দ্রগুলো এখন সুখের ঠিকানা

মাদারীপুর দর্পন

প্রকাশিত: ১৯ জুন ২০২২  

স্বপ্নের পদ্মা সেতু তৈরি করতে গিয়ে নদীর দুই পাড়ে ভাঙাগড়া কম হয়নি। ঘরবাড়ি ভাঙনের পাশাপাশি ভিটেমাটি ও কৃষিজমি হাতছাড়া হয়েছে উভয় পাড়ের বাসিন্দাদের। এ চিত্র ছিল সেতু নির্মাণকাজের শুরুর দিকের। ক্ষতিগ্রস্ত সেই মানুষরাই পেয়েছেন নতুন করে মাথা গোঁজার ঠাঁই। ঘরহারাদের জন্য নির্মাণ করে দেওয়া হয়েছে নতুন ঘর, জমিহারাদের দেওয়া হয়েছে নগদ টাকা। পদ্মা সেতুর কারণে ক্ষতিগ্রস্তদের জন্য সরকার দুই পাড়ে মোট সাতটি পুনর্বাসন কেন্দ্র তৈরি করে দিয়েছে। এখানে বর্তমানে ৩০১১টি পরিবার বাস করছে। আর এখন এই পুনর্বাসন কেন্দ্রগুলোই পরিবারগুলোর কাছে সুখের ঠিকানা হয়ে উঠেছে।

মুন্সীগঞ্জের লৌহজংয়ের কুমারভোগ ৩ নম্বর পুনর্বাসন কেন্দ্রের পরিচালনা কমিটির সভাপতি শাহ আলী বলছিলেন, 'আমাদের জমি গেছে, তাতে কষ্ট নেই। এর প্রধান কারণ স্বপ্নের পদ্মা সেতু এখন দৃশ্যমান। সেতুর দিকে তাকালে গর্ব হয়। তাছাড়া সরকার জমি নিলেও উন্নত জীবনের ব্যবস্থা করে দিয়েছে। আগে বসবাস করতে হতো খুপরি ঘরে। আর এখন পুনর্বাসন কেন্দ্রের প্রায় প্রত্যেকেই পাকা বাড়ি বানিয়ে বাস করছেন। শুধু তাই নয়; এখানে কেউ আড়াই কাঠা, কেউ ৩ কাঠা, আবার কেউ ৫ কাঠা জমি পেয়েছেন। সেখানে অনেকেই ৪ তলা-৫ তলা বাড়ি তৈরি করেছেন। সেখানে নিজে বাস করছেন, আবার ভাড়া দিয়ে টাকা আয়ও করছেন। সুতরাং পদ্মা সেতুর পুনর্বাসন কেন্দ্র এখন আমাদের কাছে সুখের ঠিকানা।'

পুনর্বাসন কেন্দ্রের ভেতরেই একটি চায়ের দোকানে বসে শাহ আলীর সঙ্গে দীর্ঘক্ষণ কথা হয়। এ সময় দোকানটিতে আরও ৮ থেকে ১০ জন বাসিন্দা ছিলেন। তাঁরাও তাঁদের মনের কথা বলতে থাকেন।

পুনর্বাসন কেন্দ্র ঘুরে দেখা যায়, পুনর্বাসন কেন্দ্রগুলোর সবচেয়ে দৃষ্টিনন্দন বিষয় এখানকার গাছগাছালির সবুজের সমাহার। বন বিভাগ থেকে এখানে প্রচুর গাছ লাগানো হয়েছে। প্রতিটি রাস্তার দু'ধারে শুধু গাছ আর গাছ। এ ছাড়া প্রতিটি পুনর্বাসন কেন্দ্র পরিচালিত হয় সুশৃঙ্খলভাবে। এখানকার বাসিন্দারা নির্বাচনের মাধ্যমে একজন সভাপতি নির্বাচন করেন। ওই সভাপতির নেতৃত্বে একটি পরিচালনা কমিটি আছে। কেন্দ্রগুলোর ভালো-মন্দ সবকিছুই দেখভাল করে এই কমিটি।

পুনর্বাসন কেন্দ্রের আরেক বাসিন্দা সিরাজুল ইসলাম বলেন, এখন মনে হয় আমরা গুলশান-বনানীর মানুষের মতো উন্নত জীবনযাপন করছি। কারণ, সেখানকার মতো আমাদের এখানেও রয়েছে আধুনিক পানি ব্যবস্থাপনা, স্যুয়ারেজ ব্যবস্থা, নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ, আধুনিক বাজার ও দৃষ্টিনন্দন মসজিদ। সবুজায়নের কারণে আমরা এক ধাপ এগিয়ে আছি। তাই বেশ সুখেই আছি।

প্রকল্প সংশ্নিষ্ট সূত্রে জানা যায়, ক্ষতিগ্রস্তদের জন্য তৈরি করা সাতটি পুনর্বাসন কেন্দ্রের মধ্যে মুন্সীগঞ্জের মাওয়া প্রান্তে চারটি এবং শরীয়তপুরের জাজিরার পূর্ব নাওডোবায় ৪ নম্বর, পশ্চিম নাওডোবার মাঝিরকান্দিতে ৬ নম্বর ও মাদারীপুরের বাকরেরকান্দিতে রয়েছে ৫ নম্বর পুনর্বাসন কেন্দ্র। মাওয়া প্রান্তের চারটির মধ্যে কুমারভোগে ৩ ও ৭ নম্বর কেন্দ্র এবং মেদিনীমণ্ডলের যশলদিয়ায় ২ ও ৮ নম্বরটি। তা ছাড়া লৌহজংয়ের দোগাছিতে রয়েছে ১ নম্বর পুনর্বাসন কেন্দ্র। এটি অবশ্য সাধারণ বাসিন্দাদের জন্য নয়। এটি পদ্মা সেতুতে কাজ করা চীনা প্রকৌশলীসহ অন্য কর্মকর্তাদের জন্য। সাতটি পুনর্বাসন কেন্দ্রে বর্তমানে ৩০১১টি পরিবার বাস করছে। কেন্দ্রে রয়েছে পাঁচটি স্কুল ও পাঁচটি স্বাস্থ্যকেন্দ্র। রয়েছে ছয়টি নান্দনিক মসজিদ ও পর্যাপ্ত খেলার মাঠ। নির্মাণ হয়েছে নান্দনিক ঘরবাড়ি। ফলে পদ্মাতীরের জনপদের চেহারা এখন পাল্টে গেছে।

পদ্মা বহুমুখী সেতু প্রকল্পের পুনর্বাসন কেন্দ্রের নির্বাহী প্রকৌশলী রজব আলী বলেন, আধুনিক সুযোগ-সুবিধা নিশ্চিত করেই সাতটি পুনর্বাসন কেন্দ্র গড়ে তোলা হয়েছে। প্রতিটি পুনর্বাসন কেন্দ্রে ব্যবস্থাপনা কমিটি গঠন করে দেওয়া হয়েছে। ওই কমিটিই কেন্দ্রের সবকিছু দেখভাল করছে।

স্কুল ও স্বাস্থ্যকেন্দ্র: মুন্সীগঞ্জ, শরীয়তপুর ও মাদারীপুর জেলায় পদ্মা সেতু প্রকল্প এলাকায় পাঁচটি পুনর্বাসন কেন্দ্রে নির্মিত প্রাথমিক বিদ্যালয়ে ২০১৭ সালের ১ মার্চ থেকে পাঠদান কার্যক্রম চালু হয়েছে। একই বছরের ২ এপ্রিল থেকে কেন্দ্রগুলোতে প্রাথমিক স্বাস্থ্যকেন্দ্রের কার্যক্রম শুরু হয়।

জানা যায়, বিদ্যালয়গুলোতে প্রধান শিক্ষক, শিক্ষকদের কক্ষসহ আটটি কক্ষ রয়েছে। প্রতিটি স্বাস্থ্যকেন্দ্রে মেডিকেল অফিসার, উপ-মেডিকেল অফিসার, নার্স, ফার্মাসিস্টসহ ৯ জন নিয়োগ দেওয়া হয়েছে। স্বাস্থ্যকেন্দ্রের পরিচালনা ও ব্যবস্থাপনায় রয়েছে রিসোর্স ইন্টেগ্রেশন সেন্টার (রিক) ও সাবলম্বী সমাজ উন্নয়ন সংস্থা (এসএসইউএস)।

পুনর্বাসন কেন্দ্রের নির্বাহী প্রকৌশলী রজব আলী বলেন, প্রাথমিক বিদ্যালয়গুলোতে প্রধান শিক্ষকসহ ২৪ শিক্ষক নিয়োগ দিয়ে পাঠদান কার্যক্রম শুরু করা হয়েছে। এ ছাড়া পিয়ন, নৈশপ্রহরী, অফিস সহকারী, মালী, ক্লিনারসহ আরও ১০ জন করে স্টাফ রয়েছে।