• মঙ্গলবার   ৩০ নভেম্বর ২০২১ ||

  • অগ্রাহায়ণ ১৬ ১৪২৮

  • || ২৪ রবিউস সানি ১৪৪৩

মাদারীপুর দর্পন

নিয়োগ পরীক্ষার প্রশ্নফাঁস চক্রে বাংলাদেশ ব্যাংকের কর্মকর্তা!

মাদারীপুর দর্পন

প্রকাশিত: ১৩ নভেম্বর ২০২১  

নিয়োগ পরীক্ষার প্রশ্নফাঁস চক্রে বাংলাদেশ ব্যাংকের একজন কর্মকর্তার সম্পৃক্ত থাকার তথ্য পেয়েছে ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশ (ডিবি)। যুগ্ম-পরিচালক পদমর্যাদার ওই ব্যক্তির নাম আলমাস আলী। তার গ্রামের বাড়ি সিরাজগঞ্জ। তিনি চক্রটির সদস্যদের বিভিন্ন তথ্য দিয়ে সহযোগিতা করতেন। এমনকি নিজেও চাকরিপ্রার্থীদের কাছ থেকে অর্থ নিয়ে প্রশ্নফাঁস সিন্ডিকেটের সঙ্গে যোগাযোগ ঘটিয়ে দিতেন। কয়েক মাস আগে নিয়োগ নিয়ে তদবিরের অভিযোগে তাকে সাময়িক বরখাস্ত করা হয়েছে বলে জানা গেছে।

যদিও বাংলাদেশ ব্যাংকের মুখপাত্র সিরাজুল ইসলাম বলেন, ‘এ বিষয়টি আমার জানা নেই। খোঁজ নিয়ে জানাতে হবে।’

আলমাস আলীর মোবাইল ফোনে যোগাযোগ করা হলে ভাতিজা পরিচয়ে এক ব্যক্তি জানান, তার চাচা নামাজে রয়েছেন। তবে দশ মিনিট পর একাধিকবার ফোন করে তার মোবাইল নম্বর বন্ধ পাওয়া যায়।

তদন্ত সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা যায়, ব্যাংকে নিয়োগ পরীক্ষার প্রশ্নফাঁস সিন্ডিকেটের অন্যতম সদস্য মোস্তাফিজুর রহমান মিলন নামের এক ব্যক্তি। তিনি পূবালী ব্যাংকের সিনিয়র অফিসার হিসেবে কর্মরত। গ্রেফতারের পর তার সঙ্গে আলমাস আলীর যোগাযোগ থাকার বিভিন্ন তথ্য পাওয়া গেছে। এগুলো এখন যাচাই-বাছাই করা হচ্ছে।

নিয়োগ পরীক্ষার প্রশ্নফাঁসের বিষয়ে ঢাকার বাড্ডা থানায় একটি মামলা হয়েছে। এর এজাহারে ২২ নম্বর আসামি হিসেবে বাংলাদেশ ব্যাংক কর্মকর্তা আলমাস আলীর নাম রয়েছে।

গত ৬ নভেম্বর থেকে ১০ নভেম্বর পর্যন্ত রাজধানীসহ আশেপাশের বিভিন্ন এলাকায় অভিযান চালিয়ে নিয়োগ পরীক্ষার প্রশ্নফাঁস চক্রের পাঁচ সদস্যকে গ্রেফতার করে ডিবি তেজগাঁও জোনাল টিম। ধরা পড়া ব্যক্তিরা হলো– মোক্তারুজ্জামান রয়েল, শামসুল হক শ্যামল, জানে আলম মিলন, মোস্তাফিজুর রহামান মিলন এবং রাইসুল ইসলাম স্বপন। তাদের মধ্যে জানে আলম মিলন রাষ্ট্রায়ত্ত রুপালী ব্যাংকের সিনিয়র অফিসার এবং মোক্তারুজ্জামান রয়েল আহসানউল্লাহ বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের আইসিটি বিভাগের কর্মকর্তা।

ব্যাংকার্স সিলেকশন কমিটির তত্ত্বাবধানে বিভিন্ন ব্যাংকের নিয়োগ পরীক্ষা গ্রহণের দায়িত্ব পালন করে আসছিল আহসানউল্লাহ বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়। প্রশ্নফাঁসের অভিযোগ ওঠার পর এই শিক্ষা প্রতিষ্ঠানকে কালো তালিকাভুক্ত করার প্রক্রিয়া চলছে বলে জানা গেছে। একইসঙ্গে পরীক্ষা বাতিল করা হয়েছে।

গোয়েন্দা কর্মকর্তারা জানান, প্রথম দফা অভিযান শেষে পাঁচজনকে গ্রেফতারের পর আদালতে সোপর্দ করে তিন জনকে দুই দিন করে রিমান্ডে নিয়ে জিজ্ঞাসাবাদ করা হচ্ছে। ইতোমধ্যে মাহফুজুর রহমান ও সাজ্জাদুর রহমান নামের দুই ব্যক্তি সাক্ষী হিসেবে আদালতে স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দিয়েছেন।

ধারাবাহিক অভিযানের অংশ হিসেবে বৃহস্পতিবার (১১ নভেম্বর) আরও তিন জনকে গ্রেফতার করা হয়। তাদের মধ্যে এমদাদুল হক খোকন ও সোহেল রানা জনতা ব্যাংকের সিনিয়র অফিসার হিসেবে কর্মরত। এবিএম জাহিদ নামে অপর ব্যক্তি ঢাকা কলেজের সাবেক ছাত্র। তিন জনকেই একদিন করে রিমান্ডে নিয়ে জিজ্ঞাসাবাদ করছে ডিবি।

ডিবি’র তেজগাঁও জোনের অতিরিক্ত উপ-কমিশনার শাহাদাত হোসেন সুমা বলেন, ‘গ্রেফতার হওয়া ব্যক্তিদের কাছ থেকে চাঞ্চল্যকর তথ্য পাওয়া গেছে। এগুলো যাচাই-বাছাই করা হচ্ছে। একইসঙ্গে কারা কীভাবে এই প্রশ্নফাঁস করতো সেই বিষয়ে বিস্তারিত জানার চেষ্টা চলছে।’

১০টি অস্থায়ী বুথ তৈরি করেছিল চক্রের হোতারা

সমন্বিত ব্যাংক নিয়োগ পরীক্ষায় প্রশ্নফাঁসকারী চক্রের সদস্যরা রাজধানীর বিভিন্ন এলাকায় দশটি অস্থায়ী বুথ তৈরি করেছিল। এসব জায়গায় আগের রাতে চাকরিপ্রার্থীদের নিয়ে প্রশ্নের উত্তর মুখস্থ করিয়ে পরীক্ষার হলে পাঠানো হতো। বিনিময়ে চাকরিপ্রার্থীদের কাছ থেকে ৫-১৫ লাখ টাকা পর্যন্ত নিতো চক্রটি।

গ্রেফতার হওয়া ব্যক্তিরা জিজ্ঞাসাবাদে জানিয়েছে– রাজধানী ঢাকার রূপনগর, মিরপুর, শেওড়াপাড়া, উত্তরা ও গাবতলী এলাকায় সিন্ডিকেটের বিভিন্ন সদস্যের তত্ত্বাবধানে এসব বুথে চাকরিপ্রার্থীদের নিয়ে যাওয়া হতো। রূপনগরের বাসার দায়িত্বে ছিলেন গোলাম রাব্বানী নামের একজন। মিরপুরে সম্রাট, মহিবুল, সুধা ও শাওনের বাসাসহ অন্যান্য বুথে দায়িত্ব পালন করেন আপন, উজ্জ্বল, লিটু, সম্রাট, সবুজ, কাফি, নাসিম, রাজীব, হাকিম, ছোট, চৌধুরী, মমিন ও জাহিদ। পুরো বিষয়টি তত্ত্বাবধান করতেন জাহিদ, জানে আলম ও মিলন। এসব বুথে সবশেষ পরীক্ষায় শতাধিক চাকরিপ্রার্থীকে ফাঁস করা প্রশ্নের উত্তর মুখস্থ করিয়ে পরীক্ষার হলে পাঠানো হয়েছিল।

গোয়েন্দা পুলিশের একজন কর্মকর্তা জানান, গ্রেফতার হওয়া মুক্তারুজ্জামান ও শ্যামল সুকৌশলে তিনবার বিভিন্ন নিয়োগ পরীক্ষার প্রশ্ন ও উত্তর ফাঁসের কথা স্বীকার করেছে। তারা বুথে প্রশ্নোত্তর মুখস্থ করানোর পাশাপাশি পরীক্ষার পাঁচ-ছয় ঘণ্টা আগেই বিভিন্ন সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ব্যবহারের মাধ্যমে প্রশ্নোত্তর বিক্রি করে বিপুল অর্থ পকেটে ভরেছে।

নিয়োগ পরীক্ষার প্রশ্নফাঁস চক্রের সদস্যদের অবৈধ উপায়ে আয়কৃত অর্থের বিষয়ে খোঁজ-খবর নেওয়ার জন্য সংশ্লিষ্ট দফতরগুলোতে চিঠি পাঠানো হবে বলে জানান ডিবি’র এই কর্মকর্তা।