• সোমবার   ৩০ নভেম্বর ২০২০ ||

  • অগ্রাহায়ণ ১৬ ১৪২৭

  • || ১৪ রবিউস সানি ১৪৪২

মাদারীপুর দর্পন
২৮৯

শোকাবহ ১৫ আগস্ট ও নিষ্ঠুর জিয়া উপাখ্যান

মাদারীপুর দর্পন

প্রকাশিত: ১৫ আগস্ট ২০২০  

আগস্ট মানেই বাঙ্গালী জাতির জন্য একটি জঘন্যতম কলংকিত শোকের মাস। এই মাসে আমরা হারাই সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ বাঙ্গালী, স্বাধীন বাংলাদেশের স্থপতি জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানসহ তাঁর পরিবারের সদস্যদের। জাতির পিতার দুই সন্তান বাঙ্গালীর কান্ডারি জননেত্রী শেখ হাসিনা ও শেখ রেহানা প্রাণে বেঁচে যান বিদেশে অবস্থান করার কারণে। এই হত্যাকাণ্ডের বিচার হয়েছে, অপরাধীদের সাজা হয়েছে। বেরিয়ে এসেছে অনেক অজানা তথ্য। হত্যাকাণ্ডের মূল সুবিধাভোগী, এই জঘন্যতম হত্যাকাণ্ডের খলনায়ক মেজর জিয়ার মরণোত্তর বিচার আজও সময়ের দাবি। আমাদের প্রজন্ম এবং পরবর্তী প্রজন্মের জন্য মেজর জিয়ার এই হত্যাকাণ্ডের সাথে সম্পৃক্ততার তথ্য জানা এবং সঠিক ইতিহাসটি ব্যাপকভাবে প্রকাশ ও প্রচার হওয়া অত্যন্ত গুরত্বপূর্ণ। স্বাধীনতার পূর্বে মেজর থেকে স্বাধীনতা পরবর্তীতে মেজর জেনারেল ও উপসেনা প্রধান হলেও ক্ষমতার মোহে জিয়াউর রহমান মেতে ওঠে প্রাসাদ ষড়যন্ত্রে।

উপাখ্যান ১

১৫ আগস্টের ভয়ংকর সেই হত্যাকাণ্ডের পরোক্ষ মদদদাতা সব সময় হত্যাকারীদের শক্তি ও সাহস জুগিয়েছে। এমনকি এই জঘন্য কাজের বিরুদ্ধে সেনাবাহিনী থেকে প্রতিরোধের কোন ব্যবস্থা নেয়া হবে না বলে হত্যাকারীদের আশ্বস্ত করে। ইতিহাসের এই কলঙ্কিত হত্যাকাণ্ডের প্রকাশ্যে নেতৃত্বদানকারী কর্ণেল (অব)ফারুক ও কর্ণেল (অব) রশিদ দেশত্যাগ করার পর ব্রিটিশ টেলিভিশন চ্যানেলের সাংবাদিক অ্যান্থনি মাসকারেনহাসকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে জেনারেল জিয়ার সম্পৃক্ততার কথা স্পষ্ট হয়। সাক্ষাৎকারে তারা বলে, ২০ শে মার্চ ১৯৭৫ সন্ধ্যা ৭.৩০ মিনিটের দিকে তারা জিয়ার বাসায় তাঁর সাথে দেখা করে এবং বলেঃ ‘‘The country required a change’’ জিয়া তাৎক্ষণিক উত্তরে বলে, “Yes, yes, let’s go outside and talk.”

বাইরে আসলে ফারুক পুনরায় জিয়াকে বলে, ‘We have to have a change. We, the Junior officers, have already worked it out. We want your support and leadership.’ জিয়া অত্যন্ত স্পষ্ট ও বলিষ্টভাবে বলে, ‘If you want to do something, yes, you, junior officers should do it yourself……’

মার্কিন সাংবাদিক লরেন্স লিফশুলজকে দেয়া সাক্ষাৎকারে রশিদ বলে যে, ‘সে (রশিদ) অনেকবার জেনারেল জিয়ার সাথে এই হত্যার পরিকল্পনা নিয়ে আলাপ করে।’ এবং রশিদ জোরালোভাবে দাবী করে যে ‘জেনারেল জিয়া বিষয়টির সাথে সম্পূর্ণভাবে সম্পৃক্ত ছিল’। (In conversation with Lawrence Lifscheltz. The daily star, December 04, 2014)

প্রথম আলোর ১৫ আগস্ট ২০১৮ তারিখে প্রকাশিত রশিদের স্ত্রী জোবায়েদা রশিদের বক্তব্য থেকে জানা যায়, জিয়া বলেন, ‘If it is a success then come to me. If it is a failure then do not involve me’ 

এখন প্রশ্ন হল, উপ সেনাপ্রধান হিসেবে স্বাধীন রাষ্ট্রের প্রেসিডেন্টকে খুন করার ষড়যন্ত্র জেনেও জেনারেল জিয়া কোন ব্যবস্থাই গ্রহন করেনি। এমনকি রাষ্ট্রপতি জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু কিংবা তৎকালীন সেনাপ্রধানকে জানাবার দাপ্তরিক কাজটিও মেজর জিয়া করেনি। তার দায়িত্বের চরম অবহেলার কারণেও জেনারেল জিয়ার বিচার হওয়া উচিত।

উপাখ্যান ২

১৫ আগস্টের সেই কলঙ্কিত দিনের মাত্র ৪১ দিন পর ২৬ সেপ্টেম্বর, ১৯৭৫ সালে জেনারেল জিয়া খোন্দকার মোশতাককে (তৎকালীন রাষ্ট্রপতি) দিয়ে ‘দায়মুক্তি’ বা ‘ইনডেমনিটি’ অধ্যাদেশ জারি করে খুনিদেরকেও রক্ষা করে। যদিও তৎকালীন সাংবিধানিক আইনে রাষ্ট্রপতি কোন অধ্যাদেশ জারি করার ক্ষমতা রাখতো না ।

এই ইনডেমনিটির মাধ্যমে ১৫ আগস্ট ১৯৭৫ এর সকল শহীদ বঞ্চিত হয় হত্যাকাণ্ডের বিচার থেকে, এমনকি বিচার চাওয়ার অধিকারটুকুও খর্ব করা হয়। যেহেতু এই ইনডেমনিটি অধ্যাদেশটি ছিল অবৈধ, আর চতুর জিয়া ১৯৭৯ এর ৯ জুলাই এর ৫ম সংবিধান সংশোধনী মাধ্যমে এই অধ্যাদেশকে তৎকালীন প্রহসনের সাংসদদের নিয়ে ‘দায়মুক্তি’ আইনে বা ‘ইনডেমনিটি’ অ্যাক্টে পরিণত করে। এই আইনে আরও ভয়ংকরভাবে সংযোজন করা হয় যে ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট থেকে ১৯৭৯ সালের ৯ এপ্রিল পর্যন্ত (৪ বছর ৮ মাসে) ঘটে যাওয়া হত্যাকাণ্ডের কোনো বিচার হবে না। একটি স্বাধীন দেশে কোন মানুষকে হত্যা করা হলে তার বিচার করাতো দূরের কথা বিচার চাওয়াই যাবে না, এমন জঘন্য আইন জিয়া পাস করেছিল শুধুমাত্র বঙ্গবন্ধুর পরিবার, জাতীয় চার নেতা, হাজার হাজার সিপাহী, মুক্তিযোদ্ধা, সেনা কর্মকর্তাদের যারা হত্যা করেছিল তাদের রক্ষা করার জন্য। এই ‘দায়মুক্তি’ বা ‘ইনডেমনিটি’ আইন বাতিল হয় ১২ নভেম্বর, ১৯৯৬ যখন বঙ্গবন্ধুর দল বাংলাদেশ আওয়ামীলীগ ও বঙ্গবন্ধু কন্যা জননেত্রী শেখ হাসিনা ক্ষমতায় আসেন।

আমরা সবাই জানি আব্রাহাম লিংকন হত্যাকাণ্ডের বিচারের রায় হয়েছিল ৩ মাসের মধ্যে, মহাত্মা গান্ধীর হত্যার বিচার হতে সময় লাগে ২ বছর, ইন্দিরা গান্ধীর হত্যার বিচার হয়েছিল ৪ বছরের মাঝে। বাঙ্গালী জাতির দুর্ভাগ্য যে জাতির পিতার হত্যার বিচারের রায় পেতে সময় লেগেছে ৩০ বছর! জিয়ার দোষরদের চক্রান্তের ফলে বাংলাদেশ আওয়ামীলীগকে ক্ষমতায় বসতে দেয়া হয় নি এই বিচারের ভয়েই।

উপাখ্যান ৩

জেনারেল জিয়া শুধু ইনডেমনিটি আইন পাশ করেই ক্ষান্ত হয়নি, ১৫ আগস্টের হত্যাকান্ডের সাথে যারা জড়িত ছিল তাদের পুরস্কৃত করেছে, চাকরি দিয়েছে বিভিন্ন দূতাবাসে। যেমনঃ

১। লেঃ কর্ণেল শরিফুল হককে (ডালিম)- প্রথম সচিব হিসেবে চীনে

২। লেঃ কর্ণেল আজিজ পাশাকে -প্রথম সচিব হিসেবে আর্জেন্টিনায়

৩। মেজর এ কে এম মহিউদ্দিন আহমেদকে- প্রথম সচিব হিসেবে আলজেরিয়ায়

৪। মেজর বজলুল হুদাকে- ২য় সচিব হিসেবে পাকিস্থানে

৫। মেজর শাহরিয়ার রশিদকে- ২য় সচিব হিসেবে ইন্দোনেশিয়ায়

৬। মেজর রাশেদ চৌধুরীকে - ২য় সচিব হিসেবে ইরানে

৭। মেজর শরিফুলকে- ২য় সচিব হিসেবে ইরানে

৮। মেজর শরিফুল হোসেনকে- ২য় সচিব হিসেবে কুয়েতে

৯। কর্ণেল কিসমত হাসেমকে- ৩য় সচিব হিসেবে আবুধাবিতে

১০। লেঃ খায়রুজ্জামানকে- ৩য় সচিব হিসেবে মিশরে

১১। লেঃ নাজমুল হোসেনকে - ৩য় সচিব হিসেবে কানাডায়

১২। লেঃ আব্দুল মাজেদকে - ৩য় সচিব হিসেবে সেনেগালে নিয়োগ দেওয়া হয়েছিল।

তবে প্রধান দুই খুনি কর্ণেল ফারুক ও কর্ণেল রশিদ চাকরি গ্রহণের চেয়ে ব্যবসায়িক সুযোগ সুবিধা গ্রহণ করে। মার্কিন অনুসন্ধানী ও বিশ্লেষক পরিষ্কার ভাবে উল্লেখ করেছেনঃ “….Zia played perhaps the most crutial of all roles. He was the key shadow man.” (The Daily star 4 December, 2014).

আর এই শ্যাডোম্যান জয় বাংলা স্লোগান ও মুক্তিযুদ্ধের বিরুদ্ধে সোচ্চার ছিল সর্বদা। বঙ্গবন্ধুর নাম-নিশানা মুছে ফেলার ও ইতিহাসের উল্টোপথে বাংলাদেশ পরিচালনা করতে লিপ্ত হয় সে।

উপাখ্যান ৪

নাটকীয়ভাবে জিয়া ক্ষমতায় আসার পরই প্রহসনের কোর্ট মার্শালের রাতের অন্ধকারে হত্যা করা হয় শতশত দেশপ্রেমী সেপাহী ও অফিসারদের। একজন প্রকৃত মুক্তিযোদ্ধা কখনো রাজাকারকে ক্ষমতার কেন্দ্রবিন্দুতে বসাতে পারে না। জেনারেল জিয়া কুখ্যাত রাজাকার শাহ আজিজুর রহমানকে প্রধানমন্ত্রী করে রাজাকারতন্ত্রের বীজ বপন করে। পাকিস্থান প্রেমী মেজর জিয়া পাকিস্তানের সকল প্রেতাত্মা পাকিস্থানপন্থী রাজনৈতিক ছোট ছোট দল, কিছু অবসরপ্রাপ্ত সেনা কর্মকর্তাদের নিয়ে জাগদল ও পরে বিএনপি প্রতিষ্ঠা করে এবং গণতন্ত্র পুনরুদ্ধারের নামে মিথ্যা প্রোপাগান্ডা করে বাংলাদেশে ফিরিয়ে এনে নাগরিকত্ব দেয় স্বাধীনতা বিরোধী ও রাজাকারের শিরোমণি গোলাম আজমসহ সকল রাজাকার, আলবদর, আল-শামস তথা জামাত ও তাদের দোসরদের। উল্লেখিত সকল কর্মকাণ্ড দেখে মনে প্রশ্ন জাগে মেজর জিয়া কি স্বতঃস্ফূর্তভাবে মুক্তিযুদ্ধে অংশ নিয়েছিল, নাকি কোন চক্রান্তের অংশ ছিল পুরোটাই? নাকি পাকিস্তানের এজেন্ট হিসেবে কাজ করেছে? কারণ মুক্তিযুদ্ধ চলাকালীন সময়েও তার ভূমিকাও স্পষ্ট নয়। আওয়ামী বিরোধী ও স্বাধীনতা বিরোধী চক্র জিয়াকে অনেক বড় করে উপস্থাপন করলেও এ অংক সহজে মেলে না। বিভুরঞ্জন সরকারের লেখা, ‘জিয়াউর রহমান কেন বঙ্গবন্ধুর প্রতি এত নির্দয় হলেন?’ এর সাথে বলতে চাইঃ

১। জিয়া মুক্তিযুদ্ধের সময় কি কোন সম্মুখ যুদ্ধে অংশ নিয়েছিল?

২। তার সরাসরি কমান্ডে কোথায় যুদ্ধ হয়েছিল?

৩। তার সেক্টরের কোনো গৌরবগাঁথা বা যুদ্ধের কথা শোনা যায় না কেন?

৪। সে মুক্তিযুদ্ধের সময় কি সেনাপ্রধানের সাথে সদাচারণ করেছে?

৫। মুক্তিযুদ্ধের সময়ও কি সে সর্বদা নিজের অবস্থান ও মর্যাদার বিষয়ে ব্যস্ত থাকত না ?

৬। কি কারণে সে বিএনপি গঠনের সময় বলেছিল, ‘Money is no problem. I shall make politics difficult for the politicians’

এত টাকার উৎস একজন জেনারেল জিয়া কোথায় পেয়েছিল?

এই সকল অংকের উত্তরের জন্য জিয়াউর রহমানের বিচার এখন সত্যিই সময়ের দাবি।

লেখকঃ অধ্যাপক ও বিভাগীয় প্রধান, কম্পিউটার বিজ্ঞান ও তথ্য প্রযুক্তি বিভাগ, বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়

(আওয়ামী লীগের অফিসিয়াল ওয়েবসাইট থেকে সংগৃহীত)

রাজনীতি বিভাগের পাঠকপ্রিয় খবর