• সোমবার   ১৭ মে ২০২১ ||

  • জ্যৈষ্ঠ ৩ ১৪২৮

  • || ০৬ শাওয়াল ১৪৪২

মাদারীপুর দর্পন

মির্জা আব্বাস কাকে টার্গেট করলেন

মাদারীপুর দর্পন

প্রকাশিত: ১৯ এপ্রিল ২০২১  

বিএনপির সাবেক সাংগঠনিক সম্পাদক ইলিয়াস আলীর নিখোঁজ ইস্যুতে স্থায়ী কমিটির প্রভাবশালী সদস্য মির্জা আব্বাসের বক্তব্য ব্যাপক আলোড়ন তুলেছে দলের ভেতর-বাইরে। নানা প্রশ্ন দেখা দিয়েছে দলের নেতাকর্মীদের মধ্যে। কেন, কী কারণে এবং কাকে উদ্দেশ করে মির্জা আব্বাস এমন বক্তব্য দিয়েছেন- তা নিয়ে চলছে ব্যাপক আলোচনা।

এ ঘটনায় বিএনপির হাইকমান্ডও বিস্মিত ও ক্ষুব্ধ আব্বাসের ওপর। দলের সর্বোচ্চ নীতিনির্ধারণ ফোরামের সদস্যের এ বক্তব্য সরকারকে ‘দায়মুক্ত’ হওয়ার সুযোগ করে দিয়েছে বলে মনে করছেন দলটির নেতাকর্মীরা। তাদের দাবি, মির্জা আব্বাস নিজের এবং দলের বড় ধরনের ক্ষতি করে ফেললেন, যা সহজে আর পুষিয়ে নেওয়া সম্ভব হবে না।

২০১২ সালের ১৭ এপ্রিল রাজধানীর বনানী থেকে গাড়িচালক আনসার আলীসহ নিখোঁজ হন ইলিয়াস আলী। এত দিন বিএনপি অভিযোগ করে আসছিল, তাকে সরকারই ‘গুম’ করে রেখেছে।

ইলিয়াস আলী নিখোঁজ হওয়ার ৯ বছর পূর্তির দিন গত শনিবার এক ভার্চুয়াল আলোচনা সভায় মির্জা আব্বাস বলেছিলেন, ইলিয়াসকে আওয়ামী লীগ সরকার গুম করেনি। গুম হওয়ার আগের রাতে দলীয় অফিসে কোনো এক ব্যক্তির সঙ্গে তার মারাত্মক বাগ্‌বিতণ্ডা হয়। এ ঘটনার পেছনে দলেরই অভ্যন্তরীণ লুটপাটকারী, বদমায়েশগুলো আছে। যদিও তার ওই বক্তব্যের পরদিনই রোববার সংবাদ সম্মেলনে মির্জা আব্বাস দাবি করেছেন, ইলিয়াস আলী ইস্যুতে তিনি যে বক্তব্য দিয়েছেন, সেটা সরকারকে কটাক্ষ করে বলা। তার মূল বক্তব্য ছিল, ইলিয়াস গুমের বিষয়ে সরকারকেই জবাব দিতে হবে। তার এ বক্তব্যকে গণমাধ্যমে বিকৃত করা হয়েছে।

সংবাদ সম্মেলনে মির্জা আব্বাস বলেন, বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য হয়ে কেন ওই কথা বলবো? সরকার জড়িত নয়- এ বক্তব্যটি আমি কটাক্ষ করে বলেছি। এর অর্থ, সরকারই বলুক ইলিয়াস আলী কোথায় আছে। সরকারকেই এর জবাব দিতে হবে। এই সরকারের সময়ে একজন তরতাজা সত্যভাষী ইলিয়াস গুম হয়ে যাবে? অথচ সরকার তা জানে না? তাহলে কে করল গুম? আমি এটা বলতে চেয়েছি।

বিএনপির উচ্চ পর্যায়ের একটি সূত্র জানিয়েছে, এ ঘটনায় দলের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান চরম ক্ষুব্ধ হয়েছেন মির্জা আব্বাসের ওপর। মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরকে উদ্দেশ করে বক্তব্য দেওয়ায় তিনিও চরম বিব্রতবোধ করছেন। কী কারণে মির্জা আব্বাস ওই বক্তব্য দিয়েছেন, সরাসরি সংবাদ সম্মেলন ডেকে সে বিষয়টি ‘ক্লিয়ার’ করতে নির্দেশনা দিয়েছেন তারেক রহমান। ভার্চুয়াল সংবাদ সম্মেলন বা সংবাদ বিজ্ঞপ্তি দিয়ে এ ঘটনার ব্যাখ্যা আব্বাস দিতে চাইলেও ক্ষুব্ধ তারেক তা নাকচ করে দেন। তারেক ছাড়াও দলটির বেশির ভাগ নেতাকর্মী, এমনকি আব্বাসের ঘনিষ্ঠজনরাও তার বক্তব্যে হতবাক হয়েছেন বলে জানা গেছে।

সূত্র মতে, ঘনিষ্ঠজনদের অনেকেই ফোন করে এই বিষয়ে আব্বাসের কাছে জানতে চেয়েও কোনো উত্তর পাননি।

ইলিয়াস আলী ‘গুমের’ জন্য যে বিএনপি নেতাদের দিকে তার অভিযোগের আঙুল, সেই নেতারা কারা, সেটি দলের কোনো পর্যায়ের নেতাকর্মী খুঁজে বের করতে পারছেন না। পাশাপাশি ‘গুম’ হওয়ার আগের রাতে দলীয় কার্যালয়ে কোন ব্যক্তির সঙ্গে ইলিয়াসের বাগবিতণ্ডা হয়েছিল, তা নিয়ে ব্যাপক কৌতূহল ছড়ালেও কাউকে চিহ্নিত করা যাচ্ছে না।

নাম প্রকাশ না করার শর্তে বিএনপির এক নেতা জানান, নিখোঁজের আগের দিন খালেদা জিয়ার বিশেষ সহকারী শিমুল বিশ্বাসের সঙ্গে ইলিয়াস আলীর বাগবিতণ্ডা হয়েছে বলে শুনেছেন তিনি। কিন্তু ইলিয়াস আলীর মতো নেতাকে গুম করার মতো ‘লম্বা হাত’ শিমুলের রয়েছে বলে দলটির কোনো নেতা বিশ্বাস করেন না।

বেশ কয়েকজন নেতা জানান, খালেদা জিয়া রাজনীতিতে সক্রিয় থাকার সময় দলটির বেশ কয়েকজন জ্যেষ্ঠ নেতার পাশাপাশি প্রয়াত সাদেক হোসেন খোকার সঙ্গেও কয়েকবার তর্ক হয়েছে শিমুল বিশ্বাসের। খোকা একদিন গুলশান কার্যালয়ে প্রকাশ্যে শিমুলকে ধমকান। কিন্তু এসব ঘটনার আলাদা তাৎপর্য রয়েছে বলে বিএনপিতে কখনো আলোচনা হয়নি। কারো মতে, ঘরোয়া আলোচনায় যেসব কথাবার্তা হয়, আগপাছ না ভেবে সেগুলোই সভায় বলে ফেলেছেন আব্বাস। আবার কারো মতে, রাজনৈতিক আলোচনায় বেশ সতর্ক আব্বাস পরিকল্পিতভাবে এবং বিশেষ কোনো মহল বা সরকারকে সুবিধা করে দিতে বিএনপিকে বিপাকে ফেলেছেন। কারণ এরই মধ্যে ওই ঘটনায় বেশ কয়েকজন আওয়ামী লীগ নেতা সরব হয়েছেন। তারা বলছেন, ইলিয়াস আলীকে নিয়ে বিএনপির মিথ্যাচারের ভয়ংকর রূপ এত দিনে উন্মোচিত হয়েছে। শনিবার রাতেই সরকার সমর্থক অনেকে আব্বাসের ওই বক্তব্যের ভিডিও আপলোড করে ফেসবুকে স্ট্যাটাস দিয়েছেন।

বিএনপির বেশ কয়েকজন সিনিয়র নেতার সঙ্গে আলোচনা করে জানা গেছে, মির্জা আব্বাসের এ বক্তব্যের পর বিএনপিতে তীব্র প্রতিক্রিয়া হয়েছে। কারণ, এত দিন বিএনপি ইলিয়াস আলী নিখোঁজের জন্য ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগকে দায়ী করে আসছিল। কিন্তু আব্বাসের এ বক্তব্য তাদের মধ্যে কিছুটা স্বস্তি এনে দিয়েছে। বিএনপির ক্ষুব্ধ নেতারা মনে করছেন, মির্জা আব্বাসের এ বক্তব্যের মাধ্যমে সরকারের হাতে নতুন হাতিয়ার তুলে দেওয়া হয়েছে এবং ইচ্ছা করেই এ অস্ত্র তুলে দেওয়া হলো।

বিএনপির গুরুত্বপূর্ণ একজন নেতা ইলিয়াস আলীর গুমের বিষয়ে সরকারকে দায়ী না করে মির্জা আব্বাস দলের রাজনীতির বিপক্ষে অবস্থান নিয়েছেন বলে অনেক নেতা মনে করছেন। তারা দাবি করছেন, মির্জা আব্বাসের এ বক্তব্যে সরকারকে 'ক্লিনচিট' দেওয়া হয়েছে। যে পরিপ্রেক্ষিতে এবং ইলিয়াস আলীর সন্ধানের দাবিতে বিএনপি দীর্ঘদিন ধরে আন্দোলন করেছে, তাকেই তিনি প্রশ্নবিদ্ধ করেছেন।

বিএনপির একজন সংসদ সদস্য নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, এ বক্তব্য দিয়ে জাতীয় সংসদ কিংবা বিভিন্ন প্ল্যাটফর্মে বিএনপির কার্যক্রমকে প্রশ্নবিদ্ধ করা হয়েছে। তাদের বক্তব্য দেওয়ার পরিসরকে সীমিত করে ফেলা হয়েছে। এ বক্তব্যের ফলে বিএনপি নতুন এক সমস্যার মধ্যে উপনীত হয়েছে। ক্ষুব্ধ নেতারা দাবি করেন, মির্জা আব্বাস নিজের বলয়ের বাইরে দলের স্বার্থে কোনো চিন্তা করেন না। ঢাকা মহানগর দক্ষিণের সদস্য সচিব হিসেবে দলের যুগ্ম মহাসচিব হাবিব-উন-নবী খান সোহেলকে তিনি একদিনও মহানগর অফিসে বসতে দেননি। দলের প্রতিটি অঙ্গসংগঠনের কেন্দ্রীয় ও ঢাকা মহানগরের সভাপতি বা সাধারণ সম্পাদকের পদে তিনি তার বলয়ের একজনকে অযোগ্য হলেও স্থান করে দিতে হাইকমান্ডকে বাধ্য করেন। যেখানে সুযোগ পান, সেখানে নিজের গ্রুপের নেতাদের পদায়ন করে বলয় শক্তিশালী করার চেষ্টা করেন। ঢাকা মহানগরের সভাপতি থাকা অবস্থায় মরহুম সাদেক হোসেন খোকার বিরুদ্ধে তিনি নানা বিষোদ্গার করেছেন। অথচ তাকে আহ্বায়ক করার পর নগরীতে একটি মিছিলও করেননি।

দলটির স্থায়ী কমিটির আরেক সদস্য গয়েশ্বর চন্দ্র রায় মনে করেন, ‘মির্জা আব্বাস হয়তো দলের খারাপ লোকদের সম্পর্কে কিছু বলতে চেয়েছেন। কিন্তু ঠিকমতো গুছিয়ে না বলতে পেরে তালগোল পাকিয়েছেন।’

‘তা ছাড়া এ ধরনের কথা বলার জন্য কেউ তাকে ফাঁদেও ফেলতে পারে’—সংশয় প্রকাশ করে বলেন গয়েশ্বর।

মির্জা আব্বাসের বক্তব্যের বিষয়ে জানতে চাইলে বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর বলেন, মির্জা আব্বাস সংবাদ সম্মেলন করে তার বক্তব্য উপস্থাপন করেছেন। এর বাইরে তার আর কিছু বলার নেই।

অবশ্য মির্জা আব্বাসের পক্ষে কয়েকজন নেতার যুক্তি, প্রত্যেক নাগরিকের নিরাপত্তা দেওয়া রাষ্ট্র ও সরকারের দায়িত্ব। সেই নিরাপত্তায় যে-ই বিঘ্ন ঘটাবে, তাকে চিহ্নিত করে বিচারের আওতায় আনা সরকারের কর্তব্য। বিএনপির নেতারা এই অপরাধের সঙ্গে জড়িত থাকলে এতদিন কেন কাউকে আইনের আওতায় আনা হয়নি। আবার একজন নাগরিক হিসেবে ইলিয়াস আলীর নিরাপত্তা কেন দেওয়া হয়নি কিংবা তাকে কেন ফিরিয়ে দেওয়া হয়নি। ইলিয়াস আলীকে ফিরে পাওয়ার জন্য তার স্ত্রী তার পরিবারসহ বর্তমান প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে দেখা করেছেন। তার কাছে আকুতি জানিয়েছিলেন। সরকার যদি স্বচ্ছ অবস্থানেই থাকে, তাহলে ইলিয়াস আলীকে কেন ফিরে পাওয়ার ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি।

বিএনপি নেতাদের অনেকের মতে, দলে আব্বাসের ওইভাবে প্রকাশ্যে-অপ্রকাশ্যে কোনো শত্রুও নেই। তাই তার ওই বক্তব্য অনেকের কাছেই ‘রহস্যময়’ ঠেকছে।