• বৃহস্পতিবার   ২৮ মে ২০২০ ||

  • জ্যৈষ্ঠ ১৪ ১৪২৭

  • || ০৬ শাওয়াল ১৪৪১

মাদারীপুর দর্পন
১২৭

বিদেশে সৃষ্টি হচ্ছে বাংলামতি চালের বাজার

মাদারীপুর দর্পন

প্রকাশিত: ১১ মে ২০২০  

সংযুক্ত আরব আমিরাতকে গত ১ মে ব্রি-৫০ (বাংলামতি) চালসহ কৃষি পণ্য উপহার পাঠিয়েছে বাংলাদেশ। এর আগে করোনাভাইরাসের বিস্তার রোধে বাংলাদেশকে সাত মেট্রিক টন চিকিৎসা সামগ্রী দেয় সংযুক্ত আরব আমিরাত।

বন্ধুত্বের প্রতিদান হিসেবে বাংলামতি চালসহ বেশ কিছু কৃষিপণ্য উপহার দেয় বাংলাদেশ। উপহারের উদ্দেশ্য দুটি- করোনাভাইরাস পরবর্তী শ্রমবাজার ধরে রাখা ও আরব আমিরাতে বাংলামতি চালসহ কৃষি পণ্যের বাজার সৃষ্টি করা। সবজি আমদানিতেও মধ্যপ্রাচ্যের দেশটিকে আগ্রহী করা। সংশ্লিষ্ট সূত্রে এ তথ্য জানা গেছে।

সূত্র জানায়, আরব বিশ্বে বিরিয়ানির জন্য সুগন্ধিযুক্ত বাসমতি চালের কোনো বিকল্প নেই। এ দেশেও আমদানি করা বাসমতি চাল ২০০ থেকে ২৫০ টাকা কেজিতে বিক্রি হয়। বাসমতি চাল সরু ও লম্বা হওয়ায় বিশ্বজুড়ে পাকিস্তান ও ভারতের এক চাটিয়া বাজার দখলে আছে। ভারতে ভালো মানের বাসমতি চাল উৎপন্ন হলেও বাজারের বড় অংশই পাকিস্তানের দখলে। বসে নেই দেশের কৃষিবিজ্ঞানীরা। গবেষেণা করে আবিষ্কার করেছেন বাসমসতির চেয়ে অনেক উন্নত মানের সুগন্ধিযুক্ত সরু ও লম্বা ধান ব্রি- ৫০ ধান। ব্রি-৫০ ধানের নাম দেওয়া হয়েছে বাংলামতি যা বোরো মৌসুমে উৎপাদন হয়।

 প্রতি একরে পাকিস্তান ও ভারতে বাসমতি ধানের সর্বোচ্চ ফলন যেখানে ৩০ থেকে ৪০ মণ, প্রতি একরে বাংলাদেশে বাংলামতি ধানের ফলন ৭০ থেকে ৮০ মণ। বাংলামতি চাল প্রতিকেজি ৬০ টাকা ৮০ টাকায় পাওয়া যায়।

সুগন্ধি ধান হিসেবে কালিজিরা, চিনিকানাই, দুলাভোগ, বাদশাভোগ, কাটারিভোগ, মদনভোগ, রাঁধুনিপাগল, বাঁশফুলসহ কয়েকটি জাতের ধান চাষ আমন মৌসুমে হয়। এছাড়া, তুলসী আতপ, তুলসীমণি, বিআর- ৫, ব্রি ধান-৩৪, ব্রিধান- ৩৭ ধানের সুগন্ধি চাল উৎপাদন হয়। চলিত বোরো মৌসুমে বাংলাদেশে সুগন্ধি বাংলামতি চাল বাংলাদেশের খাদ্য চাহিদা মিটিয়ে বিদেশে রপ্তানিতে বিশেষ ভূমিকা রাখতে পারবে বলে জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা।

সূত্র জানায়, প্রধানমন্ত্রীর শেখ হাসিনার আরব আমিরাত সফরকালে দেশটির পররাষ্ট্রমন্ত্রী শেখ আব্দুল্লাহ বিন জায়েদ আল নাহায়ান বাংলাদেশ থেকে চাল আমদানি করতে আগ্রহ প্রকাশ করেছিলেন। এর পরিপেক্ষিতে গত ১ মে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার পক্ষ থেকে আরব আমিরাতের রাষ্ট্রপতি, প্রধানমন্ত্রী ও দুবাইয়ের শাসক, আবুধাবির ক্রাউন প্রিন্স, পররাষ্ট্রমন্ত্রী, মানব সম্পদমন্ত্রী ও সংযুক্ত আরবের খাদ্য সুরক্ষা প্রতিমন্ত্রীকে উপহার পাঠানো হয়।

উপহারের তালিকায় ছিল চাল, তরমুজ, আনারস, ঢেড়স, আলু, কুমড়া, শসা, সবজিসহ বিভিন্ন জাতের কৃষি পণ্য। পাশাপাশি সংযুক্ত আরব আমিরাত কর্তৃপক্ষ প্রায় ৪০ টন তাজা শাকসবজি ও মাংস একই ফ্লাইটে নিয়ে যায়। বাংলাদেশ আশা করছে, বাংলামতি চালসহ কৃষি পণ্যের বাজার আরব আমিরাতে শিগগিরিই শুরু হবে।

কৃষি মন্ত্রণালয়ের এক কর্মকর্তা বলেন, ‘বাসমতি চালের চেয়ে আরও উন্নত মানের চাল হলো বাংলামতি। কেজি প্রতি ৫০ থেকে ৬০ টাকায় এ চালের বিশাল বাজার গড়ার পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে। সুগন্ধি চালের মধ্যে বর্তমানে বাংলামতির উৎপাদনই সবচেয়ে বেশি। টার্গেট করে এগুচ্ছে বাংলাদেশ। কম দামে বাংলামতি রপ্তানি করে বাসমতির বাজার দখলে নেওয়া হবে। পাশাপাশি কৃষি পণ্যের বাজার সম্প্রসারণ করা হবে।’ 

এ বিষয়ে জানতে কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর মহাপরিচালক ড. মো. আবদুল মুঈদের সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তাকে পাওয়া যায়নি।

কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্ততরের কন্ট্রোল রুমের দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তা কৃষিবিদ মো. রাশেদ ইফতেখার বলেন, ‘বাসমতি চালের চেয়ে আরও উন্নত মানের চাল হলো বাংলামতি। বাসমতি চালের চেয়ে অনেক কম দাম বাংলামতির। আরব আমিরাতের মতো মধ্যপ্রাচ্যর দেশগুলোতে চালের বাজার সৃষ্টি করতে কৃষি মন্ত্রণালয় উদ্যোগ নিয়েছে। মধ্যপ্রাচ্যে এ চালের সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দিতে পারলে ভবিষ্যতে সুগন্ধি চালের বাজার আমাদের দখলে আসবে। পাশাপাশি কৃষি পণ্য রপ্তানি করারও পরিকল্পনা রয়েছে। কৃষি ও পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় এ বিষয়ে কাজ করছে।’

বাণিজ্য মন্ত্রণালয় সূত্র জানায়, ২০০৮ সালে তত্ত্বাবধায়ক সরকার সব ধরনের চাল রপ্তানিতেই নিষেধাজ্ঞা আরোপ করে। পরে আওয়ামী লীগ সরকার ক্ষমতায় এসে প্রত্যাহার করলেও তখনকার নিষেধাজ্ঞার একটি নেতিবাচক প্রভাবও পড়ে। বাংলাদেশের সুগন্ধি চাল রপ্তানির বাজার ভারত ও পাকিস্তানের নিয়ন্ত্রণে চলে যায়। দেশ দুটির বাসমতিসহ সুগন্ধি চাল রপ্তানির সুযোগ তখন বেড়ে যায়।

বাংলাদেশ চাল রপ্তানিকারক সমিতির এক সদস্য বলেন, ‘প্রবাসীদের পাশাপাশি বাংলাদেশি সুগন্ধি চালের ব্যাপারে বিদেশিদেরও আগ্রহ আছে। বাংলামতি চালসহ কৃষি পণ্য দিয়ে মধ্যপ্রাচ্যের এক চাটিয়া বাজার সৃষ্টি করা সম্ভব। সুগন্ধির মধ্যে বর্তমানে বাংলামতির উৎপাদনই সবচেয়ে বেশি। কৃষি ও পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে উদ্যোগ নিলেই মধ্য প্রাচ্যে নতুন রপ্তানির বাজার সৃষ্টি হবে।’

বাংলাদেশ অটো মেজর অ্যান্ড হাসকিং মিল মালিক সমিতির সাধারণ সম্পাদক লায়েক আলী বলেন, ‘বিভিন্ন দেশে বাংলাদেশি প্রায় এক কোটি মানুষ বাস করেন। তারা ভারত-পাকিস্তানের রপ্তানি করা চালসহ শাক-সবজি কিনে খান। সরকার উদ্যোগ নিলে চালসহ সব কৃষিপণ্য রপ্তানি করতে পারে।’

কৃষিমন্ত্রী ড. আব্দুর রাজ্জাক বলেন, ‘মধ্যপ্রাচ্যে কৃষিপণ্য রপ্তানির পরিকল্পনা রয়েছে সরকারের। কিছুদিন আগে প্রধানমন্ত্রী সংযুক্ত আরব আমিরাতকে বাংলামতি চালসহ শাক-সবজি উপাহার দিয়েছেন। আশা করি, আরব আমিরাতে সুগন্ধি চালসহ কৃষি পণ্যের নতুন বাজার দ্রুত সৃষ্টি হবে।’

অর্থনীতি বিভাগের পাঠকপ্রিয় খবর