• রোববার   ২৮ ফেব্রুয়ারি ২০২১ ||

  • ফাল্গুন ১৬ ১৪২৭

  • || ১৬ রজব ১৪৪২

মাদারীপুর দর্পন

বিদেশে যেতে পারবেন না স্বেচ্ছা ঋণখেলাপিরা

মাদারীপুর দর্পন

প্রকাশিত: ২২ ফেব্রুয়ারি ২০২১  

স্বেচ্ছা ঋণখেলাপিদের বিজনেস ক্লাসে বিদেশ ভ্রমণের নিষেধাজ্ঞা ছিল আগেই। এবার তা আরো কঠোর করে ব্যাংক কম্পানি আইনের সংশোধিত খসড়া তৈরি করেছে অর্থ মন্ত্রণালয়। সংশোধিত খসড়া অনুযায়ী স্বেচ্ছা ঋণখেলাপিরা বিদেশে যেতে পারবেন না। এমনকি খেলাপি ঋণ থেকে অব্যাহতি পাওয়ার পর সর্বোচ্চ পাঁচ বছর পর্যন্ত কোনো ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানের পরিচালকও হতে পারবেন না বলে নতুন বিধান যুক্ত করা হয়েছে।

নতুন খসড়ায় স্বেচ্ছা খেলাপিদের বাড়ি, গাড়ি, কম্পানি নিবন্ধন এবং সামাজিক ও রাষ্ট্রীয় অনুষ্ঠানে দাওয়াত না দেওয়া এবং কোনো সংগঠনে পদ না পাওয়ার নিষেধাজ্ঞার প্রস্তাব আগের মতোই বহাল রয়েছে। এর আগে ফিন্যান্স কম্পানি আইন সংশোধনের প্রাথমিক খসড়ায় স্বেচ্ছা ঋণখেলাপিদের বিদেশ ভ্রমণে নিষেধাজ্ঞার কথা বলা হয়। দেশের আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলো এই আইনে পরিচালিত হয়।

ব্যাংক কম্পানি আইনের সংশোধিত খসড়ায় বলা হয়েছে, ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলো স্বেচ্ছা খেলাপিদের তালিকা বাংলাদেশ ব্যাংকে পাঠাবে। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের কমিটি ওই তালিকা চূড়ান্ত করার ৩০ দিনের মধ্যে আপিল করতে পারবে এবং এ ব্যাপারে বাংলাদেশ ব্যাংকের সিদ্ধান্ত চূড়ান্ত হবে।

সাবেক তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অর্থ উপদেষ্টা ড. এ বি মির্জ্জা মো. আজিজুল ইসলাম বলেন, ‘আইনে যা-ই থাকুক না কেন, তা বাস্তবায়ন কতটুকু হবে এ নিয়ে সংশয় থেকে যায়। কারণ ঋণখেলাপি নিরুৎসাহ করতে বিদ্যমান যে আইন রয়েছে, তা-ও তো ঠিকভাবে বাস্তবায়িত হচ্ছে না। আরেকটি বিষয় হচ্ছে, আইন হলেও ঋণখেলাপি স্বেচ্ছা না অনিচ্ছায়, এটি কিভাবে নির্ণয় করা হবে। কারণ অনেকেই ব্যবসা খারাপের অজুহাত দিয়ে খেলাপি হতে পারে। তবে সংশোধিত যে আইনটি হচ্ছে, তা বাস্তবায়ন করতে পারলে অবশ্যই স্বাগত। দেখার বিষয় কতটুকু এটি বাস্তবায়িত হয়।’

আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগের এক কর্মকর্তা বলেন, বাংলাদেশ ব্যাংক বিভিন্ন ধারা আরো কঠোর করার পরামর্শ দিলেও সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন সংগঠনের মতামত ও সার্বিক পরিস্থিতি বিবেচনায় নিয়ে প্রাথমিক খসড়ার কিছু ধারা শিথিল করা হয়েছে। খসড়াটি চূড়ান্ত করে মন্ত্রিসভা কমিটির অনুমোদনের জন্য পাঠানো হবে। 

তবে ব্যাংক পরিচালকদের খেলাপি করার ক্ষেত্রে বাধা হিসেবে চিহ্নিত বিদ্যমান আইনের ১৭ ধারায় কোনো পরিবর্তন না আনায় সংশোধিত খসড়া আইনে রূপান্তরিত হলে ব্যাংকগুলোর বিদ্যমান পরিচালকদের ঋণখেলাপি বা স্বেচ্ছা ঋণখেলাপি হিসেবে চিহ্নিত করা বাংলাদেশ ব্যাংকের পক্ষে সম্ভব হবে না বলে মনে করা হচ্ছে। এ ধারায় বলা আছে, কোনো ব্যাংকের পরিচালক অন্য ব্যাংক থেকে ঋণ নিয়ে তা পরিশোধ করলে ঋণদাতা ব্যাংক কেন্দ্রীয় ব্যাংকের মাধ্যমে ঋণগ্রহীতা পরিচালককে নোটিশ দেবে। ওই নোটিশ দেওয়ার দুই মাসের মধ্যে ঋণ পরিশোধ না করলে ঋণগ্রহীতা পরিচালক খেলাপি হিসেবে চিহ্নিত হবেন।

বিভিন্ন ব্যাংকের পরিচালকরা পরস্পরের যোগসাজশে ঋণ নিয়ে তা পরিশোধ করলেও ঋণদাতা ব্যাংকগুলো সাধারণত কেন্দ্রীয় ব্যাংকের মাধ্যমে এ ধরনের নোটিশ দেয় না।

তবে সংশোধিত খসড়ায় এ ধারায় নতুন একটি উপধারা সংযোজন করে বলা হয়েছে, নোটিশ পাওয়া কোনো পরিচালক নোটিশের কার্যক্রম চলমান থাকাকালে তিনি পরিচালক পদ থেকে পদত্যাগ করতে পারবেন না।

বর্তমানে ব্যাংকের পরিচালনা পর্ষদে একই পরিবারের চারজন একসঙ্গে পরিচালক হতে পারেন। তবে ব্যাংক কম্পানি আইনে পরিবারের আওতা ছোট হওয়ায় এক পরিবার থেকে বেশিসংখ্যক পরিচালক হতে পারছেন। এ জন্য প্রথম খসড়ায় পরিবারের সংজ্ঞায় স্বামী, স্ত্রী, বাবা, মা, ছেলে, মেয়ে, ভাই, বোন ও তাঁদের ওপর নির্ভরশীলদের কথা আছে। প্রাথমিক খসড়ায় তাঁদের সঙ্গে জামাতা, পুত্রবধূ, শ্বশুর, শাশুড়ি ও তাঁদের ওপর নির্ভরশীলদের কথা বলা ছিল, যা সংশোধিত খসড়ায় নেই।

এ ছাড়া প্রথম খসড়ায় অনিয়ম-দুর্নীতির দায়ে ব্যাংকের ওপরের দুই স্তর বা জেনারেল ম্যানেজার পর্যন্ত কর্মকর্তাদের বরখাস্ত করার ক্ষমতা বাংলাদেশ ব্যাংককে দেওয়ার কথা বলা হলেও সংশোধিত খসড়ায় তা বাতিল করা হয়েছে।

স্বেচ্ছা খেলাপিদের সামাজিকভাবে বয়কটের পক্ষে দেশের ব্যাংকাররাও। জানতে চাইলে বেসরকারি ব্যাংকের প্রধান নির্বাহীদের সংগঠন অ্যাসোসিয়েশন অব ব্যাংকারস বাংলাদেশের (এবিবি) সাবেক চেয়ারম্যান ও মিউচুয়াল ট্রাস্ট ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) সৈয়দ মাহবুবুর রহমান বলেন, ‘স্বেচ্ছা খেলাপিদের নিয়ে ভারতে একটি মাস্টার সার্কুলার আছে। ওই সার্কুলারে কারা স্বেচ্ছা খেলাপি হবেন, তাঁদের সংজ্ঞায়িত করা আছে। আমরা বিভিন্ন মহলে বারবারই বলার চেষ্টা করেছি, যদি স্বেচ্ছা খেলাপিদের জন্য দৃষ্টান্তস্বরূপ কিছু করা না হয়, তাহলে খেলাপি হওয়ার সংস্কৃতি থেকে বের হওয়া কঠিন। এটি বিভিন্নভাবে হতে পারে। বিশেষভাবে স্বেচ্ছা খেলাপি হলে কী কী সুবিধা তাঁরা পাবেন না সেটি নির্দিষ্ট করা। তবে সবার আগে স্বেচ্ছা খেলাপির সংজ্ঞা নির্ধারণ জরুরি। এরপর সংজ্ঞা অনুযায়ী যথাযথভাবে তাঁদের শনাক্ত করা। এটি সঠিকভাবে করাও ফ্যাক্ট। তাই এটি যথাযথভাবে করতে না পারলে তাঁদের বিরুদ্ধে যে ব্যবস্থাই নেওয়া হোক না কেন, তা কাজে আসবে না।’