• মঙ্গলবার   ০২ মার্চ ২০২১ ||

  • ফাল্গুন ১৮ ১৪২৭

  • || ১৮ রজব ১৪৪২

মাদারীপুর দর্পন

বিদায় ২০২০

প্রত্যাশা নতুন সূর্যের

মাদারীপুর দর্পন

প্রকাশিত: ৩১ ডিসেম্বর ২০২০  

বিষাদময় যাত্রা শেষে বিদায় নিচ্ছে ২০২০। অন্য যে কোনো বছরের চেয়ে আলাদা এ বছরের শেষ সূর্য ডুবছে আজ বিশ্বজুড়ে কভিড-১৯জনিত রোগে প্রায় সাড়ে সাত লাখ মানুষের না ফেরার দেশে চলে যাওয়ার গভীর বেদনা নিয়ে। একদিকে এই ভয়ংকর অতিমারির টিকা আবিস্কার ও তা প্রয়োগের গভীর স্বস্তি, অন্যদিকে ভাইরাসের নতুন ধরনের বিস্তারের শঙ্কা জমে আছে ২০২০-এর এই বিদায়ী সূর্যজুড়ে।
সারাবিশ্বের আট কোটির বেশি মানুষের শরীরে এখনও এই মহামারির বিষ জমে আছে। এই বিষাক্ত হাওয়ার ভেতরেই শুরু হবে নতুন বছর ২০২১।

২০১৯ সালের ৩১ ডিসেম্বর চীনের উহান থেকে খবর এসেছিল, করোনাভাইরাসের নতুন একটি ধরন গ্রাস করতে আসছে পৃথিবীকে। তারপর যত দিন গেছে, সেই আতঙ্ক আরও প্রবল হয়েছে। মহামারি দ্রুতগতিতে ছড়িয়ে পড়েছে চীনের সীমানা পেরিয়ে ইউরোপ, উত্তর আমেরিকা, দক্ষিণ আমেরিকা, আফ্রিকা হয়ে এশিয়ার প্রায় সব দেশে। বছরের দ্বিতীয় মাসেই কভিড-১৯ মহামারিতে মৃত্যুপুরীতে পরিণত হয় ইউরোপের ইতালি, স্পেন, যুক্তরাষ্ট্র ও যুক্তরাজ্য। প্রতিদিন আক্রান্ত ও মৃতের সংখ্যা বাড়তে থাকে বিশ্বের প্রায় সব দেশে। ঘরবন্দি হতে বাধ্য হয় প্রযুক্তিগত উৎকর্ষতার চরম শিখরে থাকা একবিংশ শতাব্দীর মানুষ।

এমন অভূতপূর্ব অবস্থার সঙ্গে পরিচিত ছিল না বিশ্ববাসী। 'লকডাউন' শব্দটি আগে ব্যবহূত হয়েছে কালেভদ্রে, আইনশৃঙ্খলা রক্ষার স্বার্থে। এবার মানবসভ্যতার অদৃশ্য শত্রুর সঙ্গে লড়তে সেই 'লকডাউন' শব্দটি বিশ্বজুড়ে সবচেয়ে চর্চিত শব্দে পরিণত হলো। মার্চ মাস পর্যন্ত চীন, পূর্ব এশিয়া ও ইউরোপের বিভিন্ন দেশ থেকে লকডাউনের খবর আসছিল। এর মধ্যে বাংলাদেশেও মার্চের শেষ থেকে কভিড-১৯-এর প্রকোপ বাড়তে থাকে। প্রতিদিন গড়ে ২৫ থেকে ৩০ জনের মৃত্যুর খবর আসতে থাকে। এ অবস্থায় এখানেও 'লকডাউন' ঘোষণা করা হয়। তবে সরকারের নানামুখী পদক্ষেপের কারণে বাংলাদেশে কভিড-১৯ ইউরোপ, আমেরিকা, দক্ষিণ আমেরিকা কিংবা মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোর মতো ভয়াবহ আকার ধারণ করেনি। তারপরও সাত হাজারের বেশি মানুষ প্রাণ হারিয়েছেন করোনাভাইরাসের ছোবলে।
শুধু জীবনযাপন নয়, বিশ্বব্যবস্থা বা ভূ-রাজনীতির ক্ষেত্রেও ব্যাপক পরিবর্তন এনেছে ২০২০ সাল। গত এক দশক থেকে চীনের উত্থানের ফলে বিশ্ব অর্থনীতির ভরকেন্দ্র এশিয়ার দিকে চলে আসছিল। কিন্তু কভিড-১৯-এর মারাত্মক বিস্তারের পর এর টিকা আবিস্কার ও এর বিতরণ নিয়ন্ত্রণের ক্ষেত্রে পশ্চিমা দেশগুলোর অবস্থান সেই ভরকেন্দ্রকে আবারও ফিরিয়ে নিতে চলেছে পাশ্চাত্যের দিকে।

করোনাভাইরাসের প্রকোপজনিত অবস্থায় বিশ্বের অন্যান্য দেশের মতো বাংলাদেশেও অফিস, স্কুলসহ দৈনন্দিন কাজে অনলাইন মাধ্যমের ব্যাপক ব্যবহার শুরু হয়। যেখানে ২০১৯ সালের ডিসেম্বর মাসেও দেশে ইন্টারনেট ব্যান্ডউইথ ব্যবহারের পরিমাণ এক হাজার জিবিপিএসের কম ছিল, সেখানে মে-জুন মাসেই তা এক হাজার পাঁচশ জিবিপিএসে পৌঁছে যায়। ডিসেম্বর মাসে এসে এই ব্যান্ডউইথ ব্যবহারের পরিমাণ দাঁড়ায় দুই হাজার একশ জিবিপিএস। তবে ডিজিটাল বাংলাদেশের মজবুত অবকাঠামো থাকায় বর্ধিত ইন্টারনেট ব্যান্ডউইথ চাহিদা মেটাতে কোনো সমস্যা হয়নি; বরং লকডাউনে নতুন করে জনপ্রিয় হয়ে ওঠে ই-কমার্স। স্মার্টফোন, ল্যাপটপের মতো ডিভাইসের বিক্রিও বেড়ে যায় স্বাভাবিকের চেয়ে দ্বিগুণ। ফলে ডিজিটাল ডিভাইস ব্যবহারে মানুষ অভ্যস্ত হয়ে ওঠে।
মহামারির এ সময় বছরজুড়েই প্রত্যাশা ছিল ভ্যাকসিনের। বিশ্বের বড় বড় দেশ থেকে ভ্যাকসিন আবিস্কারের কার্যক্রম শুরু হয়। এমনকি বাংলাদেশের ওষুধ কোম্পানি গ্লোব বায়োটেকও দেশেই ভ্যাকসিন তৈরির ঘোষণা দেয়। ফলে কভিড-১৯ ভ্যাকসিন উদ্ভাবনকারী দেশের তালিকায় বাংলাদেশও যুক্ত হয়। তবে বছর শেষে ভ্যাকসিনটির হিউম্যান ট্রায়াল শুরু হতে পারেনি অবশ্যপালনীয় কয়েকটি প্রক্রিয়া সম্পন্ন না হওয়ায়।

এই অতিমারির মধ্যেও বাংলাদেশের জন্য আশা বয়ে আনে বছরের শেষ মাসে দেশের সুদীর্ঘ পদ্মা সেতুর সর্বশেষ ৪১তম স্প্যান বসানোর সংবাদ। এর মাধ্যমে দৃশ্যমান হয়ে ওঠে ছয় হাজার ১৫০ মিটারের পুরো সেতু। নিজস্ব অর্থায়নে নির্মিত এ সেতু দেশের ভাবমূর্তিকে আন্তর্জাতিক ক্ষেত্রেও উজ্জ্বল করে তুলেছে। আগামী বছরের জুনে এ সেতুর নির্মাণকাজ শেষ হবে বলে প্রত্যাশা করা হচ্ছে। করোনার মধ্যেও দেশে রেমিট্যান্স প্রবাহ ছিল স্বাভাবিক। বছরের শেষ ভাগে বিশ্বব্যাংক এক প্রতিবেদনে জানায়, রেমিট্যান্স প্রবাহের ক্ষেত্রে ২০২০ সালে বিশ্বে বাংলাদেশের অবস্থান হবে অষ্টম। এ প্রতিবেদনমতে, এ বছর বাংলাদেশের রেমিট্যান্স বাড়ছে ৮ শতাংশ। কৃষকদের একাগ্র ভূমিকার ফলে কৃষি ও কৃষিজাত পণ্য উৎপাদন ছিল এ বছর আগের মতোই স্বাভাবিক, যা স্বস্তি বয়ে এনেছে অর্থনীতিতে।

২০২০-এর মার্চে ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির মুজিববর্ষের উদ্বোধন অনুষ্ঠানে আসার কথা থাকলেও শেষ পর্যন্ত তিনি আসতে পারেননি। তবে বছরের শেষে গত ১৭ ডিসেম্বর প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সঙ্গে তার ভার্চুয়াল দ্বিপক্ষীয় বৈঠক হয়। এর ফলে দু'দেশের বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক আবারও নতুন মাত্রা পায়। এ বৈঠকের আগে সাতটি সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষরিত হয় দুই দেশের মধ্যে।
বছরের শেষে গত ৪ ডিসেম্বর রোহিঙ্গাদের কক্সবাজার ক্যাম্প থেকে ভাসানচরে স্থানান্তর শুরু হয়। ভাসানচরে পৌঁছে সেখানে বসবাসের উন্নত ও আধুনিক ব্যবস্থা দেখে মুগ্ধ হন তারা। বাংলাদেশ সরকারের প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেন তারা। তবে এ ক্ষেত্রে রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসনে কার্যকর ব্যবস্থা নিতে ব্যর্থ জাতিসংঘের নেতিবাচক ভূমিকা ও বিবৃতি সবাইকে বিস্মিত করে। রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসনে বাংলাদেশ জোর কূটনৈতিক প্রচেষ্টা অব্যাহত রাখলেও আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় এ ব্যাপারে কার্যকর ভূমিকা নিতে পারেনি।
বছরের শেষে এসে হেফাজতে ইসলামের নেতা মামুনুল হক বঙ্গবন্ধুর ভাস্কর্য স্থাপনের বিরোধিতা করে এবং ভাঙার ঘোষণা দিয়ে চরম ঔদ্ধত্য দেখালে দেশজুড়ে ক্ষোভ দেখা দেয়। উগ্র ধর্মীয় মৌলবাদী সংগঠনগুলোর উদ্দেশ্যমূলক তৎপরতার বিষয়টি তখন আবারও সামনে আসে। এর মধ্যেই কুষ্টিয়ায় বঙ্গবন্ধুর ভাস্কর্য ভাঙে মাদ্রাসার কয়েকজন শিক্ষক ও ছাত্র। দেশজুড়ে ব্যাপক প্রতিবাদের মধ্যেই কুষ্টিয়ায় ফের ব্রিটিশ ঔপনিবেশবিরোধী বিপ্লবী বাঘা যতীনের ভাস্কর্য ভাঙা হয়। এসব ঘটনায় উত্তপ্ত হয়ে ওঠে রাজনৈতিক অঙ্গন। বছরজুড়ে রাজনৈতিক অঙ্গন উত্তপ্ত ছিল গণস্বাস্থ্য কেন্দ্রের কভিড-১৯ কিট বিতর্ক ও পাল্টাপাল্টি বক্তব্যে। মহামারিজনিত কারণে রাজনীতি বৃত্তাবদ্ধ হয়ে পড়ে অনলাইন মাধ্যমে। আওয়ামী লীগ, বিএনপি, জাতীয় পার্টি ও বিভিন্ন বাম দলের নেতাকর্মীরা সক্রিয় ছিলেন অনলাইন ও বিভিন্ন সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে।

২০২১ সাল বাংলাদেশের স্বাধীনতার সুবর্ণজয়ন্তীর বছর। ২০২০ সালের শেষে এসে জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের জন্মশতবার্ষিকী উপলক্ষে 'মুজিববর্ষ' উদযাপনের সময়সীমাও বাড়ানো হয়েছে। নতুন বছর তাই আশার আলোও জ্বালছে। প্রত্যাশা করা হচ্ছে, ভ্যাকসিন আসার ফলে মহামারির ছোবল মিইয়ে পড়বে, রক্ষা পাবে মানবসভ্যতা, সুপ্রতিষ্ঠিত হবে মুক্তিযুদ্ধের প্রত্যাশা ও বঙ্গবন্ধুর আদর্শ। নতুন সূর্যের কাছে এমনই প্রত্যাশা মানুষের।