• রোববার   ২৪ জানুয়ারি ২০২১ ||

  • মাঘ ১১ ১৪২৭

  • || ১০ জমাদিউস সানি ১৪৪২

মাদারীপুর দর্পন
৬৬

নিখোঁজের নাটক সাজিয়ে লাশ গুম করে বাড়ির সেপটিক ট্যাংকে

মাদারীপুর দর্পন

প্রকাশিত: ১০ জানুয়ারি ২০২১  

মাদারীপুর প্রতিনিধিঃ প্রথমে প্রেমের সম্পর্ক। পরে বিয়ের প্রলোভন দিয়ে মুর্শিদার সাথে একাধিক শারীরিক সম্পর্কে লিপ্ত হয় শাহাবুদ্দিন। একপর্যায় দুই পরিবার তাদের বিয়েও দিতে রাজি হয়। কিন্তু হঠাৎ শাহাবুদ্দিন ও তার দুই ভাই এই বিয়েতে রাজি না হওয়ায় মুর্শিদাকে হত্যার পরিকল্পনা করে শাহাবুদ্দিন। পরে শাহাবুদ্দিন তার বাড়িতে ডেকে এনে বালিশ চাপা দিয়ে হত্যা করে মুর্শিদাকে। লাশ সময় নিয়ে গুম করতে নিজেই থানায় গিয়ে মুর্শিদা নিখোঁজ হয়েছে জানিয়ে জিডি করেন। পরে বাড়ির পিছনে সেপটিক ট্যাংকের নিচে মুর্শিদার হাত-পা বেঁধে লাশ চাপা দেওয়া হয়।

রিমান্ডে মাদারীপুর জেলা গোয়েন্দা পুলিশের জিজ্ঞাসাবাদে এসব কথা জানান এ হত্যা মামলায় প্রধান আসামি শাহাবুদ্দিন আকন। আসামির স্বীকারোক্তির ওপর ভিত্তি করে গত শনিবার রাতে উপজেলার বালিগ্রাম ইউনিয়নের পূর্ব বোতলা এলাকায় শাহাবুদ্দিনের বাড়িতে সেপটিক ট্যাংকের নিচ থেকে পঁচা ও গলিত মুর্শিদার লাশটি উদ্ধার করে জেলার গোয়েন্দা পুলিশ (ডিবি)।

এদিকে দুই দিনের রিমান্ড শেষে শাহাবুদ্দিনকে রোববার বিকেলে মাদারীপুর সিনিয়র জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট আদালতে হাজির করা হয়। আদালতের বিচারক মোহাম্মদ হোসেন কাছে তিনি দোষ স্বীকার করে ফৌজদারি কার্যবিধির ১৬৪ ধারায় জবানবন্দি দিয়েছেন।

পুলিশ ও মামলার এজাহারের সূত্র জানায়, কালকিনি উপজেলার ডাসার থানার পূর্ব বোতলা গ্রামের মজিদ আকনের ছেলে শাহাবুদ্দিন আকনের (২৫) সাথে একই গ্রামের চাঁন মিয়া হাওলাদারের মেয়ে মুর্শিদা আক্তারের (১৭) প্রেমের সর্ম্পক ছিল। পরে পারিবারিক ভাবে তাদের বিয়ের পাকাপোক্ত কথাও হয়। গত বছরের ১৮ ফেব্রুয়ারি সকাল ৭টার দিকে মুর্শিদা ডাক্তার দেখানোর উদ্দেশ্যে বাসা থেকে বের হয়। মুর্শিদা বাড়িতে না ফিরে এলে মুর্শিদার বাড়ির লোকজন অনেক খোঁজাখুঁজি করেও মুর্শিদাকে না পেয়ে পরের দিন ১৯ ফেব্রুয়ারি ডাসার থানায় একটি সাধারণ ডায়েরি করেন। দীর্ঘ দিন মুর্শিদার কোনো খোঁজ না পাওয়ায় গত বছরের ৪ মার্চ মুর্শিদার মা মাহিনুর বেগম বাদী হয়ে শাহাবুদ্দিন আকনকে প্রধান আসামি করে ৫ জনের নাম উল্লেখ করে ডাসার থানায় একটি অপহরণ মামলা দায়ের করেন।

দীর্ঘ দিনেও মামলায় কোন অগ্রগতি না হওয়ায় গত ১৮ ডিসেম্বর মামলার তদন্তভার জেলা গোয়েন্দা শাখায় স্থানান্তর করে জেলা পুলিশ। পরে গত ৩১ ডিসেম্বর এ মামলায় প্রধান আসামি শাহাবুদ্দিন আকন আদালতে আত্মসমর্পণ করে। পরে আদালত শাহাবুদ্দিনকে কারাগারে প্রেরণ করেন। পরে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য ৭ দিনের রিমান্ড চেয়ে আবেদন করে ডিবি পুলিশ। পরে আদালত শুনানি শেষে দুই দিনের রিমান্ড মঞ্জুর করেন। আসামি শাহাবুদ্দিন রিমান্ডে থাকাকালীন স্বীকারোক্তিতে জানায়, তার বাড়ির সেপটিক ট্যাংকের নিচে মুর্শিদার লাশ লুকিয়ে রাখা আছে। পরে স্থানীয়দের সহযোগিতা নিয়ে শনিবার সন্ধ্যা ৭ টা থেকে রাত ৯টা পর্যন্ত দুই ঘন্টা চেষ্টা চালিয়ে শাহাবুদ্দিনের বাড়ির সেপটি ট্যাংকের নিচ থেকে মুর্শিদার লাশ উদ্ধার করে। এ সময় মুর্শিদার বোরকা, ভ্যান্টিব্যাগ, সেন্ডেল, কানের দুলসহ বিভিন্ন আলামত উদ্ধার করা হয়। পরে লাশের সুরতাল প্রস্তুত করে লাশ ময়না তদন্তের জন্য মাদারীপুর সদর হাসপাতালের মর্গে পাঠানো হয়। 

এদিকে পুলিশের দাবি, মুর্শিদাকে হত্যার পরিকল্পনাকারী শাহাবুদ্দিন একাই। তবে, মুর্শিদার পরিবারের দাবি একার পক্ষে শাহাবুদ্দিন মুর্শিদাকে হত্যা করে লাশ গুম করতে পারে না।

এ সম্পর্কে জানতে চাইলে মুর্শিদার ছোট খালু রিপন শেখ বলেন, একার পক্ষের শাহাবুদ্দিন এ হত্যাকান্ড ঘটনা সম্ভব নয়। পুলিশের এই দাবি যৌক্তিক নয়। আমরা পুলিশের এ দাবি মানি না। এ হত্যার সাথে দুই ভাই আলাউদ্দিন ও সালাউদ্দিন এবং মা হাসিনা বেগমও এ হত্যার সাথে জড়িত। মুর্শিদাকে হত্যার দিন শাহাবুদ্দিনের মা, বোন বিউটি এবং বোন জামাই নুরুল ও দেলোয়ার বাড়িতে ছিল। আমরা তাদের আসামি করেছি। নুরুল ছাড়া সবাই জামিনে চলে আসে। কিন্তু নুরুলকে আসামি করার পরেও পুলিশ তাকে গ্রেপ্তার করেনি। তিনি এখনো পলাতক।

এ সম্পর্কে জেলার পুলিশ সুপার মোহাম্মদ মাহাবুব হাসান বলেন, ‘এ হত্যাকান্ডে বিষয় আমরা স্পষ্ট কিছু প্রমাণ পেয়েছি। মুর্শিদার সাথে শারীরিক সম্পর্ক শেষে বালিশ চাপা দিয়ে তাকে হত্যা করে শাহাবুদ্দিন। লাশটি তার বাড়ির সেপটিক ট্যাংকের নিচে তিনি একাই চাপা দেন। এ সময় তার বাড়িতে কেউ ছিল না।’

জানতে চাইলে শাহাবুদ্দিনের মা হাসিনা বেগম বলেন, ‘আমার ছেলে ওই মেয়েকে মন প্রাণ দিয়ে ভালোবাসতো। ওই মেয়েকে ও মারে ফেলার কথা না। ওই মেয়ে আমার বাড়িতে প্রায়ই আসতো।  আমার ছেলে যদি এরপরেও খুন করে থাকে তাহলে আইনে যা বিচার হইবে তা হোক।’

মুর্শিদার বাবা প্যারালাইসিসের রোগী হয়ে ঘরে শয্যাশয়ী। মা মাহিনুর বেগম ঘরের উঠানে আহাজারি করতে করতে বলছিলেন, ‘আমার মাইয়াডারে শাহাবুদ্দিন ডাইকা লইয়া গেছে। ডাক্তার দেখাইয়া ওষুধ আইনা আবার বাড়িতে ফেরার কথা কইয়া গেছে। ও আর ফিরা আহে নাই রে। আমার মাইয়াডারে যারা মাইরা হালাইছে, তাগের আমি ফাঁসি চাই রে।’

মুর্শিদার স্বজন ও স্থানীয়রা জানায়, দুই ভাই ও তিন বোনের মধ্যে সবার ছোট মুর্শিদা। খাতিয়াল উচ্চ বিদ্যালয়ের দশম শ্রেণিতে পড়তেন তিনি। তিন বছর ধরে শাহাবুদ্দিনের সাথে মুর্শিদার প্রেমের সম্পর্ক। এরা উভয় প্রকাশ্যে চলাফেরা করতো। বিয়ের কথাও পাকাপাকি করা। যেদিন শেষ বের হয় সেদিন মুর্শিদাকে ডাক্তার দেখানোর কথা বলে বের করে। কারণ মর্শিদার চুল পড়ে যাওয়া নিয়ে সমস্যা ছিল। এর আগেও ডাক্তারের কাছে শাহাবুদ্দিন নিয়ে যেত।

হত্যাকান্ড কারণ সম্পর্কে জানতে চাইলে মুর্শিদার ছোট খালা বিউটি আক্তার বলেন, শাহাবুদ্দিনদের আর্থিক অবস্থা ভালো। তার দুই ভাই বিডিআরে চাকরি করে। শাহাবুদ্দিনের সাথে মুর্শিদার বিয়ের কথা হলেও মুর্শিদাদের আর্থিক অবস্থা খারাপ থাকায় পরে তারা বিয়েতে রাজি ছিল না। এ কারণেই মুর্শিদাকে হত্যা করে লাশ গুম করার চেষ্টা করে শাহাবুদ্দিন।

জাইতে চাইলে রোববার সন্ধ্যা ৭টায় মামলার তদন্তকারী কর্মকর্তা ও জেলা গোয়েন্দা পুলিশের উপপরিদর্শক (এসআই) তারিকুল ইসলাম মুঠোফোনে বলেন, ‘আসামি শাহাবুদ্দিন নিজে এই হত্যাকান্ডে সম্পকৃতা উল্লেখ করে ১৬৪ ধারায় আদালতে জবানবন্দি দিয়েছে। আপতত এর বেশি বলা যাচ্ছে না। সোমবার তার জনাববন্দির বিস্তারিত জানানো হবে।’

উপজেলা বিভাগের পাঠকপ্রিয় খবর