• বুধবার   ২৫ নভেম্বর ২০২০ ||

  • অগ্রাহায়ণ ১১ ১৪২৭

  • || ০৯ রবিউস সানি ১৪৪২

মাদারীপুর দর্পন
২৯২

কোরআনে কিছু বিষয় বারবার আনার কারণ

মাদারীপুর দর্পন

প্রকাশিত: ১০ আগস্ট ২০২০  

নওয়াব সিদ্দিক হাসান খান (রহ.) তাঁর তাফসিরে লিখেছেন, ‘বর্তমানে এমন একটি দল সৃষ্টি হয়েছে, যারা কোরআনের মনগড়া ব্যাখ্যা করে এবং পুনরাবৃত্তি হওয়া আয়াতগুলোকে কোরআনের অংশ মনে করে না। তাদের নিফরিয়্যা বলা হয়।’ ইসলামবিরোধীরা কোরআনের শৈল্পিক পদ্ধতি ও অলংকরণের বিরুদ্ধে এই অভিযোগও করে যে, কোরআনে একই ঘটনা ও একই আয়াত একাধিকবার এসেছে, একই বিষয়ের পুনরাবৃত্তি শতবার হয়েছে। এই পুনরাবৃত্তির উদ্দেশ্য কী? এই অভিযোগ নতুন কিছু নয়। আলেমরা এর একাধিক উত্তর ও ব্যাখ্যা দিয়েছেন। আল্লামা কিরমানি (রহ.) এ বিষয়ে স্বতন্ত্র বই লিখেছেন। সেখানে তিনি প্রমাণ করেছেন কোরআনে কোনো কথার পুনরাবৃত্তি নেই। বাহ্যত যেসব বিষয়ের পুনরাবৃত্তি বলে মনে হয় তা অর্থগত দিক থেকে ভিন্ন। সুতরাং কোরআনে পুনরাবৃত্তির অভিযোগ সত্য নয়।

মাসনবিতে মাওলানা জালালুদ্দিন রুমি (রহ.) এই অভিযোগের একটি সূক্ষ্ম ও কাব্যিক উত্তর দিয়েছেন। তিনি বলেছেন, ‘আমরা প্রতিদিন একই জাতীয় খাবার ও পানীয় গ্রহণ করি। কিন্তু সে ব্যাপারে আমাদের কোনো অভিযোগ থাকে না। কেননা প্রতিদিন আমরা নতুন ক্ষুধা ও তৃষ্ণার মুখোমুখি হই। তাই প্রতিবার পানি পান করার পর আমরা নতুন স্বাদ ও তৃপ্তি অনুভব করি। আমরা বলি না যে, একই পানি বারবার কেন পান করি? একইভাবে যাদের ভেতর ঈমানের তৃষ্ণা আছে, তার তালাশ আছে, সে প্রতিটি আয়াত পাঠ করে নতুন স্বাদ ও তৃপ্তি লাভ করে। পুনরাবৃত্তিতে সে বিরক্ত হয় না।’ ‘গুরারু দুরার’ বইয়ে শরিফ মর্তুজা আলামুল হুদা (রহ.) এবং ‘আল ফাউজুল কাবির’ গ্রন্থেও শাহ ওয়ালি উল্লাহ দেহলভি (রহ.) কোরআনের পুনরাবৃত্তি নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা করেছেন।

কোরআন অধ্যয়ন করলে দুই ধরনের পুনরাবৃত্তি পাওয়া যায়। এক. শব্দগত, দুই. অর্থগত। অর্থগত পুনরাবৃত্তির দ্বারা উদ্দেশ্য ভিন্ন ভিন্ন শব্দে একই অর্থ ও মর্মের পুনরাবৃত্তি। যেমন মুসা (আ.)-এর ঘটনা এবং নামাজের তাগিদ বহু জায়গায় এসেছে। তবে বিশেষ কোনো শব্দ ও বাক্যে নয়; বরং একই বিষয় ভিন্ন ভিন্ন আঙ্গিকে ও পদ্ধতিতে বিবৃত হয়েছে। আর শব্দগত পুনরাবৃত্তি দ্বারা উদ্দেশ্য একই বিষয় একই শব্দ ও বাক্যে বারবার আসা। যেমন সুরা আর রহমানের ‘ফাবি আইয়িয়ালায়ি রব্বিকুমা তুকাজ্জিবান’ আয়াতটি।

অর্থগত পুনরাবৃত্তি কয়েক ক্ষেত্রে হয়েছে। যেমন মুসা ও আদম (আ.)-এর ঘটনার মতো শিক্ষণীয় ও প্রভাব  বিস্তারকারী ঘটনার ক্ষেত্রে, একত্ববাদ, পরকাল ও নামাজের মতো বিশ্বাস ও ফরজ ইবাদতের ক্ষেত্রে, আল্লাহর সত্তা, গুণাবলি ও ক্ষমতার বর্ণনার ক্ষেত্রে।

 

বিভিন্ন ঘটনার পুনরাবৃত্তি

পবিত্র কোরআনে যেসব ঘটনার বর্ণনা এসেছে তা দুই ধরনের। কিছু ঘটনা কোরআনের একাধিক স্থানে এসেছে। যেমন মুসা (আ.) ও ইবরাহিম (আ.)-এর ঘটনা। আর কিছু ঘটনা শুধু এক স্থানে বর্ণিত হয়েছে। যেমন জুলকারনাইন, আসহাফে কাহাফ, ইউসুফ (আ.), ইউনুস (আ.), জাকারিয়া (আ.), দাউদ (আ.), সুলাইমান (আ.) প্রমুখের ঘটনা। কোরআনে চারজন নবীর আলোচনা বারবার এসেছে। তাঁরা হলেন আদম (আ.), ইবরাহিম (আ.), মুসা (আ.) ও ঈসা (আ.)। প্রশ্ন হলো, একই ঘটনা কেন বারবার এলো? উত্তর হলো, মানুষ প্রাকৃতিকভাবেই অন্যের অবস্থা ও ঘটনা দেখে প্রভাবিত হয় এবং শিক্ষা গ্রহণ করে। এ জন্য পবিত্র কোরআনসহ সব ঐশী গ্রন্থের একাধিক স্থানে বিভিন্ন ঘটনার বিবরণ এসেছে। এসব আয়াত নির্দেশ করে—কোনো জাতি আল্লাহর অবাধ্য হলে তার পরিণতি কত ভয়াবহ হয় এবং অনুগত জাতিকে আল্লাহ কেমন সুখ ও সমৃদ্ধি দান করেন। এমন ঘটনা বারবার না শুনলে তার শিক্ষা ও প্রভাব যথাযথ হয় না।

একইভাবে একটি তথ্য যেমন একাধিক বিষয়ের প্রমাণ হতে পারে, তেমনি একটি ঘটনা নানাভাবে ব্যাখ্যা করা যায়। কোরআনে একটি ঘটনা ভিন্ন ভিন্ন আঙ্গিকে উল্লেখ করে তার মাধ্যমে মানবজাতির প্রতি পৃথক বার্তা দেওয়া হয়েছে। মুসা (আ.)-এর ঘটনা কোরআনের একাধিক স্থানে উল্লেখ করা হয়েছে। তবে চিন্তা করলেই স্পষ্ট হয়ে যায় যে, প্রতিটি বিবরণে পৃথক শিক্ষা ও বার্তা রয়েছে। কোথাও আল্লাহর ক্ষমতা ও বড়ত্ব, কোথাও বনি ইসরাঈলের প্রতি আল্লাহর দয়া ও অনুগ্রহ, কোথাও আল্লাহর অবাধ্যতার পরিণতি, কোথাও বনি ইসরাঈলের অবাধ্যতা ও অকৃতজ্ঞতা, কোথাও ফেরাউনের ঔদ্ধত্য ও তার পরিণতির বর্ণনা দেওয়া হয়েছে। এমনিভাবে আদম (আ.)-এর ঘটনা মানুষের প্রতি আল্লাহর অনুগ্রহ, মানবজাতির সম্মান, মানুষের দুর্বলতা, প্রবৃত্তির কুপ্রবণতা, অহংকারের পরিণতি ইত্যাদি বিষয়ের প্রমাণ।

এখন প্রশ্ন হলো, অসংখ্য নবী ও রাসুলের মধ্য থেকে কেন মাত্র চারজন নবীর ঘটনার পুনরাবৃত্তি হলো? উত্তর হলো—কোরআনে মূলত চারটি শ্রেণির মানুষকে সম্বোধন করা হয়েছে। সাধারণভাবে সব মানুষকে এবং বিশেষভাবে ইহুদি, খ্রিস্টান ও মক্কার মুশরিকদের। সাধারণ মানুষের জন্য আদম (আ.) এবং মক্কার মুশরিকদের জন্য ইবরাহিম (আ.)-এর ঘটনার পুনরাবৃত্তি হয়েছে। আর ইহুদিদের জন্য মুসা (আ.) এবং খ্রিস্টানদের জন্য ঈসা (আ.)-কে প্রমাণ হিসেবে উপস্থাপন করা হয়েছে। কোরআনে মুসা (আ.)-এর নাম ১৩৫ বার, ইবরাহিম (আ.)-এর নাম ৬৬ বার এবং ঈসা (আ.)-এর নাম ২৪ বার এসেছে।

 

ফরজ ইবাদত ও বিশ্বাসগুলোর পুনরাবৃত্তি

বেশির ভাগ ফরজ ইবাদত ও বিশ্বাস সংক্রান্ত বিষয়গুলোর পুনরাবৃত্তি হয়েছে পবিত্র কোরআনে। যেমন কোরআনে একত্ববাদের প্রশংসা এবং শিরক ও কুফরির নিন্দা সাড়ে তিন শ বার, ঈমানের বর্ণনা ও নির্দেশনা তিন শ বার, পুনরুত্থানের বর্ণনা ১৯৫ বার এবং জাহান্নামের বর্ণনা দুই শ বার এসেছে। শাহ ওয়ালিউল্লাহ দেহলভি (রহ.) এসব বিষয়ের বর্ণনার পুনরাবৃত্তি সম্পর্কে বলেছেন, কোরআনে যেসব বিষয় উল্লেখ করা হয়েছে তা দুই প্রকার। এক. এমন বিষয়, যা আইনবিষয়ক। উদ্দেশ্য সম্বোধিত ব্যক্তিকে সংশ্লিষ্ট বিধান জানিয়ে দেওয়া। যেমন তালাক, খুলআ, জিহার, ইলা, মিরাস, কিসাস, সাক্ষ্যদান ইত্যাদি।

দুই. যা বিশ্বাস ও আমল সংক্রান্ত। আল্লাহর প্রত্যাশা হলো মানুষ এসব বিষয় আত্মস্থ করবে এবং এর রং ধারণ করবে। আল্লাহ এসব বিষয় এতবার উল্লেখ করেছেন যেন মানুষ তা থেকে কোনোভাবেই বিচ্যুত না হয়। ঈমান, নামাজ, একত্ববাদ, আল্লাহর স্মরণ, পুনরুত্থান, বিচার দিবস, শাস্তি ও পুরস্কারের বর্ণনা কোরআনের সবখানে আছে, যেন বিষয়গুলো মানুষের অন্তরে গেঁথে যায়। (সংক্ষেপিত)