• রোববার   ১৩ জুন ২০২১ ||

  • জ্যৈষ্ঠ ৩০ ১৪২৮

  • || ০৩ জ্বিলকদ ১৪৪২

মাদারীপুর দর্পন

কৃষিতে কমেছে শ্রম, বেড়েছে উৎপাদন

মাদারীপুর দর্পন

প্রকাশিত: ১১ মে ২০২১  

ফেনীর দাগনভূঞা উপজেলার পূর্বচন্দ্রপুর গ্রামের কৃষক আব্দুর রহমান। চলতি বোরো মৌসুমে ২৮০ শতক জমির ৮০ মন ধান ঘরে তুলেছেন তিনি। সেচ ব্যবস্থা ভাল থাকায় ফলনও বেশ ভাল হয়েছে, কিন্তু বিপত্তি বাঁধলো ধানের দাম নিয়ে। স্থানীয় ব্যাপারীদের কাছে ধানের ভাল দাম না পাওয়ায় চিন্তার ভাঁজ পড়েছে তার কপালে।

এমন পরিস্থিতিতে কৃষক আব্দুর রহমানের সঙ্গে দেখা হয় স্থানীয় উপ-সহকারী কৃষি কর্মকর্তা আব্দুল্লাহ আল মারফের। সমস্যার কথা খুলে বললে কৃষি কর্মকর্তা জানালেন চিন্তার কোনো কারণ নেই, ন্যায্যমূল্যে সরকারি ভাবেই কেনা হবে ধান। সেজন্য তথ্য ও প্রযুক্তি মন্ত্রণালয়ের ‘কৃষকের অ্যাপ’ নামক মোবাইল অ্যাপে রেজিস্টেশন করতে হবে, তারপর নির্ধারিত সময়ে সরকারি গুদামে কেনা হবে ধান। কৃষি কর্মকর্তার কথাশুনে চিন্তা মুক্ত হলেন এই কৃষক।

শুধু এই একজন কৃষক নয়- কৃষিখাতে তথ্য-প্রযুক্তি সেবা বৃদ্ধির ফলে উপকৃত হচ্ছেন এমন হাজারো কৃষক। এখন কৃষি কাজ করতে হলে অনেক বছরের অভিজ্ঞতার দরকার পড়েনা। বিভিন্ন কৃষি বিষয়ক অ্যাপ, ওয়েভ সাইট এবং সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ফেজবুক ও ইউটিউব ব্যবহার করেই কৃষি কাজ করে সফল হচ্ছেন অনেকে।

তেমনই একজন জেলার সমুদ্র উপকুলীয় সোনাগাজী ধান গবেষণা এলাকার তরুণ মো. আবু সাঈদ রুবেল।  সৌদি আরবে একটি আন্তর্জাতিক হোটেলের ব্যবস্থাপনায় চাকরি করতেন এই তরুণ। বিদেশের মাটিতে আয় রোজগারও বেশ ভালো ছিলো। নানা প্রতিকূলতায় আর টানাপোড়নে শেষ পর্যন্ত আর সেখানে থাকা হয়নি তার। ফিরে এলেন দেশে। হাতাশ হয়ে এদিক সেদিক ঘুরছিলেন। তার এ হতাশা লক্ষ করলেন সোনাগাজী ধান গবেষণা কেন্দ্রের এক কর্মকর্তা। সেই কর্মকর্তার পরামর্শেই রুবেল এখন সফল কৃষি উদ্যোক্তা। কারোর কাছ থেকে তাকে কৃষি কাজ শিখতে হয়নি- কৃষি ভিত্তিক অ্যাপ কৃষকের জানালা ও আজকের কৃষি অ্যাপ এবং বিভিন্ন ওয়েব সাইট দেখে নিজে নিজেই পরিণত হয়েছেন পুরোপুরি কৃষকে।

এখন প্রতি মাসে তার আয় ছাড়িয়েছে অর্ধলক্ষাধিক টাকা। তার কৃষি খামারে গড়ে প্রতিদিন ২০ থেকে ২৫ জন শ্রমিক কাজ করেন। রুবেল বলেন, তাদের পারিবারিক ৩২ একর জমিতে তিনি চাষাবাদ করছেন। বোরো, আউশ আমন ধানসহ বিভিন্ন সবজির চাষাবাদের পাশাপাশি মাছ ও মুরগির খামারও আছে তার।

ফেনী সদর উপজেলার কালিদহ ইউনিয়নে আলোকদিয়া গ্রামে গেল বোরো মৌসুমে এক বিঘা জমিতে ধান চাষ করেন কৃষক রবিউল হক। জমি তৈরি করার পর চারা লাগাতে গিয়ে পড়েন বিপত্তিতে। লকডাউনের কারণে মিলছিলোনা শ্রমিক। সমাধান দিলেন স্থানীয় সদর উপজেলা কৃষি অফিস। তার ধান রোপণ করা হয় আধুনিক মেশিন রাইস ট্রান্সপ্লান্টার দিয়ে।

কৃষক রবিউল বলেন, এক বিঘা জমিতে বোরো ধানের চারা রোপণ করতে তিন থেকে চার জন শ্রমিক লাগতো। এতে তিন থেকে চার হাজার টাকা খরচও হতো। আধুনিক এই যন্ত্রের সাহায্যে মাত্র এক ঘণ্টায় এক বিঘা জমিতে ধানের চারা রোপণ করা যায়। খরচও লেগেছে অনেক কম।

কৃষি সম্প্রসারণ অধিপ্তরের অতিরিক্ত উপ-পরিচালক কৃষিবিদ আবু তাহের বলেন, কৃষকদের আধুনিক কৃষক হিসেবে গড়ে তুলতে কৃষি বিভাগ কাজ করে যাচ্ছে। আধুনিক তথ্য প্রযুক্তির ব্যবহার ও যান্ত্রিকীকরণ প্রকল্পের আওতায় কৃষি বিভাগ কৃষকদের সুবিধার্থে ভর্তুকির মাধ্যমে এই যন্ত্রসহ অন্যান্য আধুনিক যন্ত্র সরবরাহ করছে। এতে করে কৃষকেরা অনেক লাভবান হচ্ছেন।

কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের ফেনীর উপ-পরিচালক ও কৃষিবিদ মুহাম্মদ শহিদুল ইসলাম (ভারপ্রাপ্ত) বলেন, এককালে হালের বলদ, লাঙল-জোয়ালই ছিল কৃষকের মূল ভরসা। সারাদিন কায়িক শ্রমের বিনিময়ে মাঠে ফলতো স্বপ্নের ফসল। আধুনিক প্রযুক্তির উৎকর্ষতায় সেদিন আর নেই। নতুন নতুন তথ্য-প্রযুক্তির ব্যবহার ও যন্ত্রপাতির ব্যবহারে দেশের কৃষিখাতে এসেছে বৈপ্লবিক পরিবর্তন। এসব যন্ত্রের ব্যবহারের ফলে কৃষকের কমেছে শ্রম ও খরচ, অপরদিকে কয়েকগুণ বেড়েছে উৎপাদন।  

অতীতে যখন লাঙল-জোয়াল আর হালের বলদ ছিল কৃষকের চাষাবাদের মূল উপকরণ সে জায়গা এখন দখল করে নিয়েছে আধুনিক সব যন্ত্র ও মোবাইলের কৃষি ভিত্তিক বিভিন্ন অ্যাপ ও ওয়েব সাইট। কৃষির যন্ত্রপাতি যেমন আধুনিক হয়েছে, তেমনি উন্নত পদ্ধতিতে চাষাবাদও হচ্ছে। কৃষকের পরিশ্রম কমিয়ে কৃষিকাজকে সহজসাধ্য করার লক্ষ্যে সরকার ডিজিটাল মাধ্যমে নানা ধরনের উদ্যোগ নিয়েছে। ই-কৃষি বা উন্নত প্রযুক্তি ব্যবহার করে বিভিন্ন প্রকল্প বাস্তবায়ন করা হচ্ছে। উদাহরণ হিসেবে তিনি কৃষকের জানালা অ্যাপের কথা উল্লেখ করেন।

এ মোবাইল আ্যাপটির মাধ্যমে কৃষক ধান রোপণ, পোকা দমন, সার দেওয়া এবং সবজি চাষাাবাদসহ কৃষির যাবতীয় তথ্য পেয়ে যাচ্ছে খুব সহজে। কারোর কাছে যেতে হচ্ছেনা, মোবাইলের স্ক্রিনেই মিলছে সব সমাধান।  

কৃষি কর্মকর্তারা বলছেন, কৃষিতে তথ্য-প্রযুক্তি ও যন্ত্রের ব্যবহার যেসব কৃষক করছেন তারা কম শ্রমে অধিক ফসল উৎপাদন করতে পারছেন। কৃষিতে প্রযুক্তি ও যন্ত্রের ব্যবহার বাড়ানোর জন্য সরকার ইতোমধ্যে কিছু কার্যক্রম হাতে নিয়েছে। এবং সেগুলো বাস্তবায়নের জন্য মাঠ পর্যায়ে কাজ করে যাচ্ছে।