• শনিবার   ২৬ সেপ্টেম্বর ২০২০ ||

  • আশ্বিন ১১ ১৪২৭

  • || ০৮ সফর ১৪৪২

মাদারীপুর দর্পন
২৪৬

ঈদ ও কোরবানির আনন্দে যেন ভেসে না যায় জিলহজের আমল

মাদারীপুর দর্পন

প্রকাশিত: ২৫ জুলাই ২০২০  

জিলহজ মাস। মুসলিম উম্মাহর কাছে এ মাসটির গুরুত্ব ও তাৎপর্য অনেক। এ মাসেই মুসলিম উম্মাহর বৃহৎ উৎসব পবিত্র ঈদুল আজহা ও ফরজ ইবাদত হজ পালিত হবে। প্রেমের সাগরে ভাসবে কাবা প্রাঙ্গন। ত্যাগ ও কোরবানির মাঝ দিয়ে আল্লাহ প্রেমের নজীর দেখাবে মুসিলম বিশ্ব।

কোরবানি ও হজ ছাড়াও এ মাসটি আল্লাহর রাব্বুল আলামিনের কাছে অতি প্রিয় মাস। কোরআন ও হাদিসে এ মাসের গুরুত্ব ও ফজিলত তুলে ধরা হয়েছে। মাস শুরু হওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই এসব ফজিলতপূর্ণ আমল ও বর্জনীয় কাজ শুরু হয়ে যায়।

জিলহজ মাসের প্রথম দশক:

জিলহজ মাসের প্রথম দশ রাতের ইবাদত বন্দেগি লাইলাতুল কদরের রাতের ইবাদত বন্দেগির সমুতূল্য। কোরআন এবং হাদিসে এ বিষয়টি প্রমাণিত। কোরআন শরিফে সূরায়ে ফাজরে আল্লাহ তায়ালা এই দশ রাতের শপথ করে বলেছেন, ‘শপথ দশ রাতের, শপথ যা জোড় ও বেজোড়, শপথ রাতের যখন তা গত হতে থাকে।’ এই চারটি আয়াতে আল্লাহ তায়ালা পাঁচটি বস্তুর শপথ করেছেন। ১. ফজর ২. দশ রাতের ৩. জোড়ের ৪. বেজোড়ের  ৫. রাতের।

অধিকাংশ মুফাসসিরিনদের মতে দশ রাত দ্বারা জিলহজ মাসের এই দশ রাতকে বুঝানো হয়েছে। একটি মারফু হাদিস দ্বারাও এর সমর্থন পাওয়া যায়। হজরত জাবের (রা.) থেকে বর্ণিত- রাসূলে আকরাম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ইরশাদ করেছেন, এর দ্বারা উদ্দেশ্য হলো জিলহজ মাসের প্রথম দশ দিন। তাতে কোরবানির দিনও শামিল।

প্রথম দশকে রোজার ফজিলত:

উল্লিখিত দশ রাত সম্পর্কে হজরত আবু হুরায়রা (রা.) রাসূলে আকরাম সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম থেকে বর্ণনা করেন, তিনি ইরশাদ করেছেন, পৃথিবীর দিন ও রাত্রির মধ্যে আল্লাহ তায়ালার নিকট তার ইবাদতের জন্য সবচেয়ে প্রিয় হলো জিলহজ মাসের প্রথম দশ দিন, এই গুলোর তুলনায় ইবাদতের জন্য প্রিয় আর কোনো দিন নেই। এই দিনগুলোর এক একটি রোজা এক বৎসর রোজা রাখার সমতুল্য, আর ওই রাতগুলোর এক একটির ইবাদত শবে কদরের ইবাদতের সমতুল্য। (ফাযাইলুল আওকাত লিল বাইহাকী-৩৪৬, শুআবুল ঈমান, ৩/৩৫৫)।

ইমাম নবুবী (রহ.) বলেন, ‘এই  দিনগুলোতে  রোজা পালন করা মুস্তাহাব। বিশেষ করে যে ব্যক্তি হজে যায়নি তার জন্য আরাফাত দিবস তথা ৯ জিলহজে রোজা  রাখা মুস্তাহাব।’ হজরত আবু ক্বাতাদাহ্‌ (রা.) থেকে বর্ণিত- বাসূলুল্লাহ (সা.) বলেন, ‘আরাফাত দিবসের রোজা আগত এবং বিগত এক বছরের পাপ বিমোচন করে।’ (সহিহ মুসলিম)।

হাদিসে প্রথম দশকের বর্ণনা যেভাবে এসেছে:

জিলহজ মাসের প্রথম দশকে অন্যান্য নেক আমলের ফজিলত রয়েছে। ইবনে আব্বাস (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেন, ‘এমন কোনো দিন নেই যার আমল জিলহজ মাসের এই দশ দিনের আমল থেকে আল্লাহর কাছে অধিক প্রিয়। সাহাবায়ে কিরাম বললেন, হে আল্লাহর রাসূল! আল্লাহর পথে জিহাদও নয়? রাসূলুল্লাহ বললেন, আল্লাহর পথে জিহাদও নয়। তবে যে ব্যক্তি তার জান-মাল নিয়ে আল্লাহর পথে যুদ্ধে বের হলো এবং এর কোনো কিছু নিয়েই ফেরত এলো না (তার কথা ভিন্ন)।’ (বুখারি : ৯৬৯; আবু দাউদ : ২৪৪০; তিরমিযী : ৭৫৭)।

আবদুল্লাহ ইবনে ওমর রাযিআল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত- সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন, ‘এ দশ দিনে নেক আমল করার চেয়ে আল্লাহর কাছে বেশি প্রিয় ও মহান কোনো আমল নেই। তাই তোমরা এ সময়ে তাহলীল (লা-ইলাহা ইল্লাল্লাহ), তাকবীর (আল্লাহু আকবার) ও তাহমীদ (আল-হামদুলিল্লাহ) বেশি বেশি করে পড়।’ (মুসনাদ আহমাদ : ১৩২; বাইহাকী, শুআবুল ঈমান : ৩৪৭৪; মুসনাদ আবী আওয়ানা : ৩০২৪)।

অন্য বর্ণনায় রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন, ‘জিলহজ মাসের (প্রথম) দশদিনের মতো আল্লাহর কাছে উত্তম কোনো দিন নেই। সাহাবীরা (রা.)  বললেন, ইয়া রাসূলাল্লাহ! আল্লাহর পথে জিহাদেও কি এর চেয়ে উত্তম দিন নেই? তিনি বললেন, হ্যাঁ, কেবল সে-ই যে (জিহাদে) তার চেহারাকে মাটিতে মিশিয়ে দিয়েছে।’ (সহিহুত তারগীব ওয়াত তারহীব : ২/১৫; মুসনাদ আবী আওয়ানা : ৩০২৩)।

এ হাদিসগুলোর মর্ম হলো, বছরে যতগুলো মর্যাদাপূর্ণ দিন আছে তার মধ্যে এ দশ দিনের প্রতিটি দিনই সর্বোত্তম। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এ দিনসমূহে নেক আমল করার জন্য তাঁর উম্মতকে উৎসাহিত করেছেন। তার এ উৎসাহ প্রদান এ সময়টার ফজিলত প্রমাণ করে। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম এ দিনগুলোতে বেশি বেশি করে তাহলিল ও তাকবির পাঠ করতে নির্দেশ দিয়েছেন।

প্রথম দশকে পূর্বসূরীদের আমল:

ইবন রজব রহিমাহুল্লাহ বলেন, বর্ণিত হাদিসগুলো থেকে বুঝা যায়, নেক আমলের মৌসুম হিসেবে জিলহজ মাসের প্রথম দশক হলো সর্বোত্তম। এ দিবসগুলোর নেক আমল আল্লাহর কাছে অধিক প্রিয়। হাদিসের কোনো কোনো বর্ণনায় ‘আহাব্বু’ তথা ‘সর্বাধিক প্রিয়’ শব্দ এসেছে। আবার কোনো কোনো বর্ণনায় ‘আফযালু’ তথা সর্বোত্তম শব্দ ব্যবহৃত হয়েছে। অতএব, এ সময়ে নেক আমল করা বছরের অন্য যেকোনো সময়ে নেক আমল করার থেকে বেশি মর্যাদা ও ফজিলতপূর্ণ। এজন্য উম্মতের অগ্রবর্তী পুণ্যবান মুসলিমরা এ সময়গুলোতে অধিকহারে ইবাদতে মনোনিবেশ করতেন। যেমন আবু ছিমান নাহদী বলেন, ‘তারা অর্থাৎ সালাফ তথা পূর্বসূরীরা দশককে অনেক বেশি মর্যাদাবান জ্ঞান করতেন: রমজানের শেষ দশক, জিলহজ মাসের প্রথম দশক এবং মুহাররমের প্রথম দশক।’

এছড়াও যাবতীয় সৎ কাজ অধিক হারে আদায় করা, যেমন: নামাজ, রোজা, সাদকাহ্‌ (দান), কোরআন তেলাওয়াত, জিকির, নিকটাত্মীয়ের সঙ্গে সদাচার, সৎকাজের আদেশ এবং অসৎ কাজে নিষেধ, তওবা, ক্ষমাপ্রার্থনা ইত্যাদি। কেননা সৎ আমলের প্রতিদান এইদিন গুলোতে যেমন অধিক হারে বৃদ্ধি পায়, তেমনি সৎ আমলই অল্লাহর মাগফিরাত ও রহমতকে নির্দিষ্ট করে।

অন্যান্য ইবাদত:

বর্ণিত নফল আমল ছাড়াও জিলহজ মাসে বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ আমল ও ফরজ বিধান রয়েছে। যেমন, ওমরাহ পালন, হজ পালন ও কোরবানি করা।

হজ ও উমরাহ পালন:

আল্লাহ তায়ালা বলেন, ‘সামর্থ্যবান মানুষের ওপর আল্লাহর জন্য বায়তুল্লাহর হজ করা ফরজ। আর যে ব্যক্তি কুফরি করে, তবে আল্লাহ তো নিশ্চয় সৃষ্টিকুল থেকে অমুখাপেক্ষী।’ (সূরা: আলে ইমরান, আয়াত: ৯৭)।

হজরত আবু হুরায়রা (রা.) থেকে বর্ণিত, বাসূলুল্লাহ্‌ (সা.) বলেন,  ‘এক ওমরাহ‌ থেকে অপর ওমরাহর মাঝে সংঘটিত পাপ-সমূহ এমনিই বিমোচিত হয়। আর মাকবুল হজের বিনিময় নিশ্চিতভাবে জান্নাত।’ (বুখারি ও মুসলিম)।

কোরবানি করা:

ঈদের দিন বা আইয়ামে তাশরীকে (জিল হজ্জের ১১, ১২ ও ১৩ তারিখ) কোরবানি করা। কোরবানি আমাদের পিতা ইব্রাহিম (আ.) এর সুন্নত। আল্লাহ তাকে ঈসমাইল (আ.) এর বিনিময়ে একটি বিরাট কোরবানি দান করেছিলেন। আল্লাহ‌ তায়ালা বলেন, ‘আপনার পালনকর্তার উদ্দেশ্যে নামাজ পড়ুন ও কোরবানি করুন।’(কাউছার-৩)।

তাকবির বলা:

নির্দিষ্ট এবং অনির্দিষ্ট তাকবির উঁচু আওয়াজে বলা সুন্নত। নারীরা নিচু আওয়াজে তাকবির বলবে। আর পুরুষরা উঁচু আওয়াজে।

অনির্দিষ্ট তাকবির:

অনির্দিষ্ট তাকবির হচ্ছে সময় বা স্থান নির্দিষ্ট না করা। যেমন, বাড়ি, মসজিদ, বাজার ইত্যাদি স্থানে। জিলহজের প্রথম দিন থেকে নিয়ে ঈদের দিন পর্যন্ত যেকোনো সময় এই তাকবির চলতে থাকবে। ইমাম বুখারি (রহ.) বলেন, হজরত ইবনে ওমর (রা.) এবং হজরত আবু হুরায়রা (রা.) এই দিনগুলোতে তাকবির বলতে বলতে বাজারে যেতেন এবং তাদের দেখে লোকেরাও তাকবির বলত।

নির্দিষ্ট তাকবির:

নির্দিষ্ট তাকবির হচ্ছে, নির্দিষ্টভাবে পাঁচ ওয়াক্ত নামাজের পর তাকবির বলা। এরূপ তাকবির আরাফাত দিবসের ৯ জিলহজ ফজর নামাজ থেকে শুরু হয়ে চলতে থাকবে ‘আইয়ামে তাশরিক’ তথা ১৩ জিলহজ মাসের আসর পর্যন্ত। মোট ২৩ ওয়াক্ত। ইমাম ইবনে তাইমিয়া (রহ.) বলেন, তাকবিরের ব্যাপারে বিশুদ্ধ মত হলো যাতে পূর্বসূরী অধিকাংশ সাহাবা, ফিকাহ্‌বিদ এবং ইমামদের ঐকমত্য হলো, ‘তাকবির আরাফাত দিবসের ফজর থেকে শুরু হয়ে আইয়ামে তাশরীকের শেষ দিবস পর্যন্ত প্রত্যেক নামাজের পর বলতে হবে।’

তাকবির:

উচ্চারণ: ‘আল্লাহু আক‌বার, আল্লাহু আক‌বার, লাইলাহা ইল্লাল্লাহু, ওয়াল্লাহু আকবার আল্লাহু আক‌বার ওয়া লিল্লাহিল হাম‌দ।’

প্রথম দশকে বর্জনীয় কাজ:

জিলহজের প্রথম দশকে করণীয় আমলে পাশাপাশি কিছু বর্জনীয় কাজও রয়েছে। এগুলোও মুমিন বান্দাদের লক্ষ্য রাখতে হবে। 

নখ ও চুল কাটা থেকে বিরত থাকা সুন্নত: 

রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেন, ‘তোমাদের কেউ যদি জিলহজের চাঁদ দেখে এবং কোরবানি করার ইচ্ছা করে তাহলে সে যেন কোরবানি পর্যন্ত স্বীয় চুল, নখ ইত্যাদি কাটা থেকে বিরত থাকে।’ (মুসলিম)।

জিলহজ মাস শুরু হলে শরীরের অতিরিক্ত পশম, যেমন, মাথার চুল, নাভির নিচের বা বোগলের পশম কাটা থেকে বিরত থাকতে বলেছেন। এটি সুন্নত একটি আমল। উম্মে সালামা (রা.) হতে বর্ণিত রাসূল (সা.) বলেন, ‘জিলহজ মাস শুরু হলে যে ব্যক্তি কোরবানি করতে চায় সে যেন তার চুল ও নখ না কাটে।’ (সহিহ মুসলিম, অধ্যায়: কোরবানি)।

অন্য বর্ণনায় রয়েছে, ‘শরীরের চামড়া যেন না কাটে।’ (সহিহ মুসলিম)। এ প্রসঙ্গে সহিহ মুসলিম ও তিরমিযীতে আরো একধিক হাদিস রয়েছে।

অতএব, যারা কোরবানি করার ইচ্ছে পোষণ করছেন, তারা জিলহজ মাসের চাঁদ দেখা যাওয়ার পর থেকে হাত পায়ের নখ, মাথার চুল ও অবাঞ্ছিত চুল ইত্যাদি কাটবে না, যদি ৪০ দিন না হয়ে থাকে এগুলো না কাটার মেয়াদ। যদি ৪০ দিনের বেশি হয়ে থাকে, তাহলে এসব কেটে ফেলা আবশ্যক। নতুবা ১০ দিন পর কোরবানির পর পরিষ্কার করবে। এ কাজটি সুন্নত।

এছাড়াও এসব দিনে অন্যায় অশ্লীলতা ও পাপাচার যেমন, গান-বাদ্য, নগ্ন ফিল্ম, মাদকদ্রব্য ইত্যাদি থেকে বিরত থাকতে হবে। এগুলো পূর্বের আমলসমূহ বিনষ্টের কারণ হতে পারে।